যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অভিবাসন নীতি: ৭৫ দেশের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা প্রক্রিয়া স্থগিত | US to Suspend Immigrant Visa Processing for 75 Countries: Global Impact and Analysis
বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত—৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা প্রক্রিয়া স্থগিত করা হচ্ছে। এই নীতির ফলে কারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, কেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো এবং এর বৈশ্বিক প্রভাব কী—সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ।

যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অভিবাসন নীতি: ৭৫ দেশের জন্য ইমিগ্র্যান্ট ভিসা প্রক্রিয়া স্থগিত | US to Suspend Immigrant Visa Processing for 75 Countries: Global Impact and Analysis - Ajker Bishshow
বিশ্বের অন্যতম প্রধান ভ্রমণ ও অভিবাসন গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রে একটি বড় নীতি পরিবর্তনের ঘোষণা এসেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগ জানিয়েছে যে আগামী ২১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসী ভিসা (Immigrant Visa) প্রক্রিয়া স্থগিত করা হবে, এবং এই পদক্ষেপটি অনিশ্চিত সময় পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
এই সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র ইমিগ্র্যান্ট ভিসা প্রক্রিয়া-র ওপর প্রযোজ্য হবে; পর্যটন, ব্যবসায়িক বা শিক্ষার্থী ভিসা (non-immigrant visas)-এর প্রক্রিয়া এই ধরনে স্থগিত হবে না।
কি ঘোষণা করা হলো?
মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র টমি পিগট এক বিবৃতিতে বলেছেন, “আমরা ৭৫টি দেশের জন্য অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়া স্থগিত করবো, যারা এমন আবেদনকারীদের থেকে ভিসা চাইছেন যাঁরা সম্ভাব্যভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বজনীন সহায়তার উপর নির্ভর করতে পারে।” এই পদক্ষেপটি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থা পুনর্মূল্যায়নের উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে এবং নিয়ন্ত্রণ কঠোর করার অংশ।
অর্থাৎ, 'পাবলিক চার্জ' (public charge) নিয়মকে প্রাধান্য দিয়ে, এমন আবেদনকারীদের বেছে বের করা হবে যারা যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সহায়তার উপর নির্ভর হতে পারেন। এই ‘পাবলিক চার্জ’ ধারনাটি দীর্ঘদিনের অভিবাসন নীতির অংশ হলেও, এবার এর প্রয়োগ ব্যাপক মাত্রা পেয়েছে।
কেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে?
যুক্তরাষ্ট্রি সরকার বলছে যে, এই পদক্ষেপটি গ্রহণ করা হয়েছে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা ও সরকারী সহায়তার অপব্যবহার প্রতিরোধে। পররাষ্ট্র দফতর জানায় যে, অনেক আবেদনকারী এমন সম্ভাব্য ব্যক্তিরূপে বিবেচিত যে তারা যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি সহায়তা গ্রহণ করতে চাইবে — এবং সেটি “অগ্রহণযোগ্য হারে”।
এছাড়া উল্লেখ করা হচ্ছে যে এমন কিছু দেশের নাগরিকরা ট্যাক্সদাতাদের বিপক্ষে অত্যধিক সরকারি সুবিধা গ্রহণের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ও চাকরির বাজারে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। যদিও বিস্তারিত পরিসংখ্যান সরকার প্রকাশ করেনি, এই যুক্তিটি প্রশাসন প্রচারে বারবার উল্লেখ করছে।
এটি কোন ধরনের ভিসাকে প্রভাবিত করবে?
এই স্থগিতাদেশের আওতায় শুধু অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়া আসবে — অর্থাৎ যারা স্থায়ী বসবাস বা গ্রীন কার্ডের জন্য আবেদন করছেন। এর মধ্যে রয়েছে:
- পরিবারভিত্তিক ইমিগ্র্যান্ট ভিসা
- চাকরি বা কর্মসংস্থান ভিত্তিক অভিবাসী ভিসা
- ভালুকা (Diversity) ভিসা এবং অন্যান্য স্থায়ী ভিসা
তবে এটি পর্যটক, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, চিকিৎসাজনিত বা অস্থায়ী ভিসা-র ওপর প্রযোজ্য হবে না।
কতক্ষণ স্থগিত থাকবে?
এখনো পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা হয়নি। পররাষ্ট্র বিভাগ জানিয়েছে যে ভিসা প্রক্রিয়া তখনই আবার শুরু হবে যখন তারা “ভাল যাচাই-বাছাই ব্যবস্থা” নিশ্চিত করতে পারবে এবং নতুন অভিবাসীদের জনসেবায় নির্ভরশীল হওয়ার ঝুঁকি কমবে।
এই অনিশ্চিত সময়ের স্থিরতা নেই, ফলে অনেকে ধারণা করছেন এটি আগামী কয়েক মাস বা বছরের জন্য স্থায়ী হিসেবে থাকতে পারে।
৭৫টি দেশের তালিকা ও প্রভাবিত দেশগুলো
প্রকাশিত অংশিক তালিকায় দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের মতো দক্ষিণ এশিয়ার দেশও রয়েছে। এছাড়া আফগানিস্তান, ইরান, রাশিয়া, নাইজেরিয়া, থাইল্যান্ড, ব্রাজিলসহ বিভিন্ন অঞ্চলের দেশগুলো এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত।
এই তালিকা এমন দেশগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করেছে যাদের নাগরিকরা প্রায়ই সরকারি সহায়তার জন্য আবেদন করেন বা যুক্তরাষ্ট্রের জব মার্কেটে ওঠা-নামা করতে ঝুঁকি বেশি বলে বিবেচিত হয়।
তালিকায় নাম থাকা বাংলাদেশের মত দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য এটি একটি বড় ব্যর্থায়ক খবর হতে পারে, বিশেষ করে যারা শিক্ষার্থী, কর্মী, পরিবার মিলনের ইচ্ছা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে ধারাবাহিকতা
এই পদক্ষেপটি একেবারে নতুন নয়; বরং এটা একটি ধারাবাহিক বিপুল পরিসরের নীতির অংশ। কারণ:
- আগে থেকেই কিছু দেশ থেকে ভ্রমণ ও ইমিগ্র্যান্ট ভিসা নিষেধ ছিল।
- গত বছর ট্রাম্প প্রশাসন বিভিন্ন অভিবাসন নীতি কড়াকড়ি করেছিল এবং ভিসা প্রত্যাহার করেছে।
- ভর্তুকি-নির্ভর আবেদনকারীদের ওপর “পাবলিক চার্জ” নিয়ম অনেক আগে থেকেই জারি ছিল; যেটি এবার বড় পরিসরে প্রয়োগ করা হচ্ছে।
এই সর্বোচ্চ কঠোর নীতি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা ও সমালোচনার কারণ হয়েছে, বিশেষ করে এমন মানুষের জন্য যারা ইতোমধ্যেই অভিবাসন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ বছর অপেক্ষা করছেন।
সমালোচনা ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
বিশ্বজুড়ে এবং অভিবাসন-মন্থর নীতিবিদদের কাছ থেকে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বাম-ডান সব পক্ষেই সমালোচনা উঠেছে। কিছু বিশ্লেষক বলছেন এটি:
- বিশ্বের অনেক দেশগুলোর মানুষের প্রতি বৈষম্যসূচক মনোভাব সৃষ্টি করবে।
- এটি অনেক পরিবারের পুনর্মিলন ও শ্রমবাজারে সুষ্ঠু প্রবেশকে ব্যাহত করবে।
- আইনি অভিবাসীদের জন্য একটি ভয়াবহ precedent স্থাপন করতে পারে।
ডেভিড বিয়ার, ইমিগ্রেশন স্টাডিজের পরিচালক, বলেছেন যে এই পদক্ষেপটি “ইতিহাসের সবচেয়ে বিরূপ আইনি অভিবাসন নীতির অংশ” এবং এটি প্রায় **৩১৫,০০০ বৈধ অভিবাসীকে বার্ষিক ভিত্তিতে ব্লক করতে পারে”।
অনেক দেশ, বিশেষ করে আফ্রিকা ও এশিয়া-প্রধান দেশগুলো, এই সিদ্ধান্তকে মানবিক মূল্য ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমস্যা হিসেবে দেখছে।
বাংলাদেশ ও অন্যান্য দেশের প্রতিক্রিয়া
বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের ওপর এই স্থগিতাদেশের প্রভাব স্বভাবতই বিস্তর। সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়াগুলো অন্তর্ভুক্ত:
- স্টুডেন্ট ওয়ার্ক প্ল্যানের বিলম্ব: যারা উচ্চশিক্ষা বা শ্রম ভিসার জন্য অপেক্ষা করছেন, তাঁরা এখন অনিশ্চিততায় পড়বেন।
- পরিবার পুনর্মিলনে বাধা: বহু পরিবারের সদস্যদের পুনর্মিলনের ইচ্ছা ছিল, তা স্থগিত হতে পারে।
- দেশীয় অর্থনৈতিক প্রবাহে প্রভাব: অভিবাসীরা পাঠানো রেমিট্যান্স ডলারের প্রবাহ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
- রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা: বাংলাদেশ ও অন্যান্য দেশগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনার চাপ বৃদ্ধি পেতে পারে।
বাংলাদেশে এখনও সরকারিভাবে কোনো বিস্তারিত মন্তব্য পাওয়া যায়নি, কিন্তু এমন পদক্ষেপটি দেশীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষণ: এই সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
এই স্থগিতাদেশ কেবল একটি ভিসা নীতি পরিবর্তন নয়; এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, শ্রম বাণিজ্য, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের উপরও ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। এর মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট:
অর্থনৈতিক প্রভাব: অভিবাসীর আগমন কমলে শ্রম শক্তিতে ঘাটতি সৃষ্টি হতে পারে, বিশেষ করে এমন সেক্টরগুলোতে যেখানে বিদেশী কর্মীর প্রয়োজন বেশি।
শিক্ষা ও গবেষণা: আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও গবেষকদের আগমন কমে গেলে গবেষণা-উন্নয়ন ও বিশ্বমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সমস্যা তৈরি হতে পারে।
মানবিক ও সামাজিক প্রভাব: বহু পরিবার দীর্ঘ দিন ধরে একসাথে থাকার জন্য অপেক্ষা করছেন; এই সিদ্ধান্ত তাদের জীবনে অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক স্তরে আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়া স্থগিত করা হবে, এবং এটি মানবিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক বিভিন্ন দিকেই বিশাল প্রভাব ফেলতে পারে।
এটি একটি শক্তিশালী নীতি পরিবর্তন, এবং এর পূর্ণ প্রভাব আগামী মাস ও বছরে ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হবে। ajkerbishshow.press এই ঘটনার উন্নয়ন ও প্রভাব নিয়ে আপনাকে নিয়মিত আপডেট প্রদান করবে।
Related Posts
View All
বিশ্ব থেকে সরে যাচ্ছে আমেরিকা? ৬৬টি UN ও আন্তর্জাতিক সংস্থা ছাড়ার ঘোষণা ট্রাম্পের| US Withdraws from 66 UN and International Bodies: A Turning Point in Global Politics
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে দেশটি একযোগে ৬৬টি UN ও আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই পদক্ষেপকে কেউ দেখছেন জাতীয় স্বার্থ রক্ষার কৌশল হিসেবে, আবার কেউ বলছেন—এটি বহুপাক্ষিক বিশ্ব ব্যবস্থার জন্য এক ঐতিহাসিক ধাক্কা।

শপথ কুরআন হাতে! মামদানির সাশ্রয়যোগ্যতা ও সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রা | Mamdani Swears In with Quran in Hand, Sets Bold Agenda for NYC
নিউইয়র্কের নতুন মেয়র জোহারান মামদানী তার প্রথম দিনেই ঘোষণা করেছেন “সাশ্রয় ও সমৃদ্ধি” কর্মসূচি। শপথগ্রহণ করেছেন কুরআন হাতে, এবং নিরাপত্তা, সাশ্রয়যোগ্য জীবন ও সমৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এই নতুন প্রশাসন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা উন্নত করতে এবং শহরের অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে দৃঢ় পদক্ষেপ নিচ্ছে।






