লাইফ সাপোর্টে ওসমান হাদি! বাঁচার সম্ভাবনা কতটুকু? নতুন তথ্য বের হচ্ছে | The Truth Behind the Shooting of Osman Hadi—Timeline & Motive
জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে রাজধানীর বিজয়নগরে ভয়াবহ হত্যাচেষ্টার শিকার হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদি। দিবালোকে মাথায় গুলি ছোড়া এই ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় চলছে। হামলার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছে, কেন ঘটেছে, কারা জড়িত—সব মিলিয়ে তদন্তে উঠে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

লাইফ সাপোর্টে ওসমান হাদি! বাঁচার সম্ভাবনা কতটুকু? নতুন তথ্য বের হচ্ছে | The Truth Behind the Shooting of Osman Hadi—Timeline & Motive - Ajker Bishshow
২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর, শুক্রবার বিকেল। ঢাকা শহরের ব্যস্ত পল্টন–বিজয়নগর এলাকায় দিনের আলোয় ঘটে গেল এক ভয়াবহ ঘটনা—গুলিবিদ্ধ হলেন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র এবং ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদি। মাথায় গুরুতর গুলিবিদ্ধ অবস্থায় যখন তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়, তখনই স্পষ্ট হয়ে যায়—এটি সাধারণ কোনো হামলা নয়, বরং একটি টার্গেটেড অ্যাসাসিনেশন অ্যাটেম্পট।
ঘটনার পর থেকে দেশজুড়ে তোলপাড়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের মাঝে প্রবল ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। সরকার, প্রশাসন এবং রাজনৈতিক দলগুলো নানা বিবৃতি দিচ্ছে। নির্বাচনের ঘোষিত তফসিলের একদিন পর এমন ঘটনা দেশের রাজনীতিতে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এই রিপোর্টে পুরো ঘটনার টাইমলাইন, হামলার সম্ভাব্য কারণ, কারা জড়িত থাকতে পারে, ওসমান হাদির বর্তমান অবস্থা, গণমাধ্যম কী বলছে, এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণ—সব কিছু ধাপে ধাপে তুলে ধরা হলো।
হামলার আগের পরিস্থিতি: সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কী ঘটেছিল
১২ ডিসেম্বর সকাল থেকেই ঢাকা-৮ আসনে ব্যস্ত দিন কাটাচ্ছিলেন ওসমান হাদি। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর তাঁর প্রচারণা কয়েকদিন ধরেই জোরেশোরে চলছিল। বিজয়নগর, পল্টন, বকশীবাজার—এলাকার বিভিন্ন স্থানে কর্মীরা তাঁকে নিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছিলেন।
তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন—হাদির প্রচারণায় কয়েকদিন ধরে দুইজন রহস্যজনক ব্যক্তি দেখা যাচ্ছিল, যারা নিজেদেরকে “স্বেচ্ছাসেবক” পরিচয় দিচ্ছিল। পরে বিভিন্ন ভিডিও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এরা সম্ভবত পরবর্তীতে শ্যুটারদের সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজন।
হাদি দুপুরে জুমার নামাজ শেষে বিজয়নগর এলাকায় আবার প্রচারণা শুরু করেন। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায় তিনি একটি রিকশায় উঠছেন এবং চারপাশে কয়েকজন প্রচারণাকর্মী সাথে আছেন।
হামলা: কীভাবে গুলি করা হলো
হামলাটি ঘটে বিকেল আনুমানিক ২টা ২৫ মিনিটে, বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট রোড–এ। ঘটনাটি ঘটে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে।
ঘটনার নিশ্চিত তথ্যগুলো হলো:
- একটি মোটরসাইকেলে চড়ে দুইজন অস্ত্রধারী খুব কাছে এসে অবস্থান নেয়।
- একজন শ্যুটার অত্যন্ত কাছে দাঁড়িয়ে হাদির বাঁ কান বরাবর মাথায় গুলি করে।
- গুলি করার পর তারা মুহূর্তেই দ্রুতগতিতে সেখান থেকে পালিয়ে যায়।
- আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে—মোটরসাইকেলটি আগে থেকেই এলাকা পর্যবেক্ষণ করছিল।
- প্রচুর লোকজন ও ট্রাফিক থাকা সত্ত্বেও খুব দ্রুততার সাথে তারা পালাতে সক্ষম হয়।
হাদির মাথা দিয়ে প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। উপস্থিত জনতা তাকে রিকশায় করে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়।
হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর যা ঘটে
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসা
- সেখানে পৌঁছানোর পরই চিকিৎসকরা জানান, হাদির অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন।
- মাথার ভেতরে গুলি আটকে আছে, যা তাঁর ব্রেনের গুরুতর ক্ষতি করেছে।
- দ্রুত তাকে নিউরোসার্জারি অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়।
- অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ থামাতে বিপুল পরিমাণ রক্ত প্রয়োজন হয়।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জরুরি রক্ত সংগ্রহ
হাদির বিরল গ্রুপের রক্ত প্রয়োজন হওয়ায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জরুরি ভিত্তিতে রক্ত সংগ্রহ করে, যা দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো হয়—এটি গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছে।
লাইফ সাপোর্টে নেওয়া
সন্ধ্যার মধ্যে চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেন—
- হাদি লাইফ সাপোর্টে আছেন,
- তাঁর অবস্থা একেবারেই আশঙ্কাজনক,
- স্নায়ুর ক্ষতি এতটাই ব্যাপক যে চিকিৎসকরা “সামান্য সম্ভাবনা” নিয়ে কাজ করছেন।
এরপর রাতের দিকে পরিবার ও চিকিৎসক দলের সিদ্ধান্তে তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
হাদির বর্তমান অবস্থা—বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা কতটুকু?
চিকিৎসকদের বক্তব্য অনুযায়ী:
- তাঁর ব্রেনের একটি বড় অংশ গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
- গুলিটি জটিল স্থানে আটকে থাকায় অপসারণ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
- ফুসফুস এবং হৃৎপিণ্ডের কার্যকারিতা বজায় রাখতে সম্পূর্ণ লাইফ সাপোর্টের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
- মেডিকেল টিম বলেছে—বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম।
এমনকি একাধিক চিকিৎসক বলেছেন:
“তার অবস্থা খুবই সংকটজনক, আমরা খুব সীমিত আশায় চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছি।”
কারা হামলা চালালো? কেন?
তদন্তে কী কী বেরিয়ে এসেছে**
এখন পর্যন্ত (১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত) কোনো গ্রেপ্তার হয়নি। তবে তদন্তের বিভিন্ন দিক গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।
সিসিটিভি থেকে পাওয়া তথ্য
- দুই শ্যুটার অত্যন্ত পেশাদার।
- তারা ২–৩ দিন ধরেই এলাকাটি পর্যবেক্ষণে ছিল।
- মোটরসাইকেলের নম্বরপ্লেট ভুয়া বা পরিবর্তিত।
সম্ভাব্য উদ্দেশ্য নিয়ে বিশ্লেষণ
১) রাজনৈতিক উদ্দেশ্য
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন এমন হামলা হওয়ায় রাজনৈতিক মহল বলছে—
এটি নির্বাচনের পরিবেশ অস্থিতিশীল করার সুস্পষ্ট চেষ্টা।
২) ভিতরের ষড়যন্ত্র
কয়েকজন সহযোগী দাবি করেছেন—হাদির আশেপাশে কয়েকদিন ধরে থাকা রহস্যজনক দু’জন তরুণ আসলে হামলাকারীদের সহযোগী হতে পারে।
৩) নীরব করার প্রচেষ্টা
হাদি ছিলেন উন্মুক্তভাষী এবং সরকার–বিরোধী, প্রশাসন–বিরোধী কিছু বক্তব্য দেওয়ার কারণে অনেক শক্তি তাঁর ওপর বিরক্ত ছিল—এমন অভিযোগ পরিবার–সহযোগীদের।
বিভিন্ন দলের প্রতিক্রিয়া
- বিএনপি: বলেছে এটি “গণতন্ত্রে আঘাত” এবং “দুর্বৃত্তদের পরিকল্পিত হামলা”।
- AB পার্টি, NCPসহ বিভিন্ন দল: একে রাজনৈতিক হত্যাচেষ্টা বলে দাবি করেছে।
- সরকার: কোনো দল বা গোষ্ঠীকে দায়ী করেনি; বলেছে—“তদন্ত চলছে”।
পুলিশ ও প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ঘটনাটিকে “পরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলা” আখ্যা দিয়েছে এবং বলেছে—
যা যা করছে পুলিশ:
- পুরো বিজয়নগর–পল্টন এলাকা স্ক্যান করা হচ্ছে।
- ২০+ সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ চলছে।
- শ্যুটারদের সম্ভাব্য রুট ট্র্যাক করা হচ্ছে।
- DB, CID, PBI–সব সংস্থা যৌথভাবে কাজ করছে।
- সম্ভাব্য সহযোগীদের শনাক্ত করতে মোবাইল টাওয়ার ডাম্প ডেটা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
চিফ অ্যাডভাইজার মুহাম্মদ ইউনূস নির্দেশ দিয়েছেন—
“হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।
কোনো ধরনের নির্বাচনী সহিংসতা বরদাশত করা হবে না।”
দেশজুড়ে প্রতিক্রিয়া—প্রতিবাদ, বিক্ষোভ, মানববন্ধন
হামলার পরপরই বিভিন্ন স্থানে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
প্রতিবাদগুলো হলো:
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ।
- ঢাকা মেডিকেল কলেজে মানববন্ধন।
- ঝালকাঠিতে সড়ক অবরোধ, টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ।
- চাঁপাইনবাবগঞ্জ, বরিশাল, খুলনা—বিভিন্ন এলাকায় তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ সমাবেশ।
- অনলাইনে লাখো মানুষের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া।
প্রতিবাদকারীদের মূল দাবি—
“২৪ ঘণ্টার মধ্যে হামলাকারীকে চিহ্নিত করো”,
“রাজনৈতিক হত্যার বিচার চাই”,
“নির্বাচনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক”।
গণমাধ্যম কী বলছে?
তাদের বিশ্লেষণ কী?**
বেশিরভাগ বিশ্বস্ত গণমাধ্যম বলছে—
এটি একটি পরিকল্পিত টার্গেটেড অ্যাটাক, যার উদ্দেশ্য হয়:
- নির্বাচনী মাঠে ভয় দেখানো,
- স্বাধীন প্রার্থী বা তরুণ কর্মীদের চুপ করানো,
- অথবা কোনো বৃহৎ রাজনৈতিক অসন্তোষ সৃষ্টি।
অনেক সাংবাদিক বিশ্লেষণে বলছেন—
- হামলাকারীরা প্রশিক্ষিত,
- পালানোর পরিকল্পনা আগে থেকেই সাজানো,
- এবং হামলা ছিল “এক শটে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে”।
এই ঘটনার তাৎপর্য কী এবং সামনে কী ঘটতে পারে
ওসমান হাদির ওপর হামলা শুধু একটি ব্যক্তি–নির্ভর ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং নির্বাচন–পূর্ব নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
এখন পর্যন্ত যেসব বিষয় পরিষ্কার—
১) হামলাটি পরিকল্পিত।
২) হামলাকারীরা পেশাদার ছিল।
৩) উদ্দেশ্য রাজনৈতিক প্রভাব–সৃষ্টি বা অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে।
৪) হাদির জীবনঝুঁকি এখনো অত্যন্ত বেশি।
৫) দেশজুড়ে জনরোষ তীব্র হচ্ছে।
৬) সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চাপের মুখে রয়েছে দ্রুত গ্রেপ্তারের জন্য।
পরবর্তী ২৪–৭২ ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—
- তদন্তে প্রথম গ্রেপ্তার কবে হয়,
- শ্যুটারদের পরিচয় কী,
- হাদির স্বাস্থ্য কী দিকে যায়,
- এসবই দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।
Watch Video
Related Posts
View All
ঢাকা–করাচি সরাসরি ফ্লাইট: বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন যুগের সূচনা | Dhaka-Karachi direct flight: The beginning of a new era in Bangladesh's foreign policy
দীর্ঘ এক দশকের বিরতির পর আবার চালু হতে যাচ্ছে ঢাকা–করাচি সরাসরি ফ্লাইট। এই সিদ্ধান্তকে নিছক বিমান যোগাযোগ নয়, বরং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি বড় কৌশলগত পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা সম্পন্ন: রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন সম্পূর্ণ | Khaleda Zia Laid to Rest with State Honours in Dhaka
রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা ঢাকায় সম্পন্ন হয়েছে। হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় অনুষ্ঠিত জানাজার পর তাকে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পাশে দাফন করা হয়। দেশজুড়ে রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ রাজনীতির এক যুগের অবসান: না ফেরার দেশে বেগম খালেদা জিয়া | Khaleda Zia Dies at 80: End of an Era in Bangladesh Politics
তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেমে এসেছে গভীর শোক। দীর্ঘ অসুস্থতার পর তার মৃত্যু দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগের সমাপ্তি টেনে দিল।








