ঢাকা–করাচি সরাসরি ফ্লাইট: বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন যুগের সূচনা | Dhaka-Karachi direct flight: The beginning of a new era in Bangladesh's foreign policy
দীর্ঘ এক দশকের বিরতির পর আবার চালু হতে যাচ্ছে ঢাকা–করাচি সরাসরি ফ্লাইট। এই সিদ্ধান্তকে নিছক বিমান যোগাযোগ নয়, বরং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি বড় কৌশলগত পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

ঢাকা–করাচি সরাসরি ফ্লাইট: বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন যুগের সূচনা | Dhaka-Karachi direct flight: The beginning of a new era in Bangladesh's foreign policy - Ajker Bishshow
দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় পর আবারও চালু হতে যাচ্ছে ঢাকা–করাচি সরাসরি বিমান যোগাযোগ। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এই সিদ্ধান্তকে নিছক একটি পরিবহন ব্যবস্থা পুনরায় চালু করার ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি বড় কৌশলগত পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে দিল্লি-কেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতির অভিযোগ থেকে বেরিয়ে এসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক পথ অনুসরণ করতে চায়, এই ফ্লাইট তারই একটি বাস্তব প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
পাকিস্তানের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম জিও নিউজসহ একাধিক আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক গণমাধ্যমের খবরে জানানো হয়েছে, পাকিস্তানের সিভিল অ্যাভিয়েশন অথরিটি (CAA) বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধের পর রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে ঢাকা–করাচি সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনার আনুষ্ঠানিক অনুমতি দিয়েছে। প্রাথমিকভাবে এই অনুমতি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দেওয়া হলেও খুব শিগগিরই নিয়মিত ফ্লাইট শুরুর সম্ভাবনা রয়েছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নতুন কূটনৈতিক বাস্তবতা
ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ ছিল, আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের প্রতি একপাক্ষিক আনুগত্য দেখাতে গিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে কার্যত দিল্লির দাবার গুটিতে পরিণত করেছিল। বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার আড়ালে ভারতের তথাকথিত আধিপত্যবাদ বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত করে রেখেছিল বলে সমালোচকরা মনে করেন।
এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরই ঘোষণা দেয়—বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে জাতীয় স্বার্থই হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। সেই নীতির আলোকে সরকার একদিকে যেমন ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়নের ইঙ্গিত দিয়েছে, তেমনি দীর্ঘদিন অবহেলিত পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক ও উষ্ণ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
ঢাকা–করাচি সরাসরি ফ্লাইট চালুর সিদ্ধান্তকে তাই অনেকেই শুধু একটি পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে নয়, বরং একটি স্পষ্ট কূটনৈতিক বার্তা হিসেবেই দেখছেন।
কী বলছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ
পাকিস্তানে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাই কমিশনার ইকবাল হোসেন খান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স করাচি রুটে সপ্তাহে তিনটি ফ্লাইট চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র পাওয়ার পর পাকিস্তানের সিভিল অ্যাভিয়েশন অথরিটি দ্রুত অনুমোদন দিয়েছে।
সূত্র জানায়, প্রাথমিকভাবে চলতি বছরের ৩০ মার্চ পর্যন্ত এই ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে যাত্রী চাহিদা ও কূটনৈতিক অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করে এই সময়সীমা বাড়ানো হতে পারে। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, চলতি মাসের শেষ দিকেই প্রথম ফ্লাইট আকাশে উঠতে পারে।
অতীতের ইতিহাস: একসময় নিয়মিত ছিল এই ফ্লাইট
অনেকের কাছেই হয়তো এটি নতুন মনে হলেও বাস্তবতা হলো—একসময় ঢাকা ও করাচির মধ্যে সরাসরি বিমান যোগাযোগ ছিল নিয়মিত ঘটনা। স্বাধীনতার পর আশির দশক এবং নব্বইয়ের দশকে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স (PIA) ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ঢাকা–করাচি এবং ঢাকা–লাহোর রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করত।
এই ফ্লাইটগুলো ব্যবসা, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পারিবারিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। দক্ষিণ এশিয়ার দুই গুরুত্বপূর্ণ দেশের জনগণের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বজায় রাখতে এসব ফ্লাইট ছিল এক ধরনের সেতুবন্ধন।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক টানাপড়েন, কূটনৈতিক দূরত্ব এবং যাত্রী সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে এই সরাসরি ফ্লাইটগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়। বিশেষ করে ২০১০ সালের পর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ক্রমেই শীতল হতে থাকে।
কেন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল আকাশপথ
বিশ্লেষকরা মনে করেন, যুদ্ধাপরাধের বিচার, কূটনৈতিক বক্তব্য এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে ভারতের ঘনিষ্ঠ অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ–পাকিস্তান সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বিমান চলাচলে।
দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ না থাকায় যাত্রী সংখ্যা কমে যায়, যা এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক ছিল না। ফলে ধাপে ধাপে ঢাকা–করাচি ও ঢাকা–লাহোর রুটের ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তান যেতে হলে যাত্রীদের তৃতীয় কোনো দেশ হয়ে ভ্রমণ করতে হতো, যা সময় ও খরচ—দুইই বাড়িয়ে দিত।
নতুন সিদ্ধান্তের কৌশলগত গুরুত্ব
সাম্প্রতিক সময়ে আবার সরাসরি ফ্লাইট চালুর উদ্যোগকে পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এর কৌশলগত গুরুত্ব আরও গভীরে।
বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ভারত, চীন ও পাকিস্তান—এই তিন শক্তির মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন একক বলয়ের রাজনীতিতে আটকে থাকার পর বাংলাদেশ এখন বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতির পথে হাঁটতে চাইছে।
ঢাকা–করাচি ফ্লাইট চালু হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ স্পষ্টভাবে দেখাতে চাইছে যে, সে কেবল একটি দেশের ওপর নির্ভরশীল থাকতে চায় না। বরং আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা করেই নিজের জাতীয় স্বার্থ এগিয়ে নিতে আগ্রহী।
অর্থনীতি ও জনগণের দৃষ্টিকোণ
এই সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবও কম নয়। সরাসরি ফ্লাইট চালু হলে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের জন্য যোগাযোগ সহজ হবে। চিকিৎসা, শিক্ষা ও পারিবারিক যাতায়াতও স্বাভাবিক হবে।
একই সঙ্গে এটি পর্যটন খাতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর আবার আকাশপথ খুললে মানুষের মধ্যে আগ্রহ বাড়বে, যা এয়ারলাইন্স শিল্পের জন্যও সুফল বয়ে আনতে পারে।
সামনে কী হতে পারে
ঢাকা–করাচি সরাসরি ফ্লাইট অনেক বিশ্লেষকের কাছে একটি “ডিপ্লোম্যাটিক আইস-ব্রেকার” হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে—এটি কি শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি ভবিষ্যতে বাণিজ্য, সামুদ্রিক যোগাযোগ ও অন্যান্য কূটনৈতিক সহযোগিতার পথ খুলে দেবে?
ইতোমধ্যেই করাচি ও চট্টগ্রামের মধ্যে সরাসরি শিপিং সার্ভিস চালুর খবর এই ধারণাকে আরও জোরালো করেছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশ–পাকিস্তান সম্পর্ক নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে।
ঢাকা–করাচি সরাসরি ফ্লাইট চালু হওয়া কেবল একটি বিমান রুটের পুনরুজ্জীবন নয়। এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি সাহসী ও কৌশলগত পরিবর্তনের প্রতীক। আঞ্চলিক রাজনীতির জটিল বাস্তবতায় এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশকে কোথায় নিয়ে যাবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত এটুকু স্পষ্ট—বাংলাদেশ আর একমুখী নয়, বরং বহুমুখী কূটনৈতিক পথেই হাঁটতে চাইছে।
Watch Video
Related Posts
View All
বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা সম্পন্ন: রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন সম্পূর্ণ | Khaleda Zia Laid to Rest with State Honours in Dhaka
রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা ঢাকায় সম্পন্ন হয়েছে। হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় অনুষ্ঠিত জানাজার পর তাকে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পাশে দাফন করা হয়। দেশজুড়ে রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ রাজনীতির এক যুগের অবসান: না ফেরার দেশে বেগম খালেদা জিয়া | Khaleda Zia Dies at 80: End of an Era in Bangladesh Politics
তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেমে এসেছে গভীর শোক। দীর্ঘ অসুস্থতার পর তার মৃত্যু দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগের সমাপ্তি টেনে দিল।







