বাংলাদেশ রাজনীতির এক যুগের অবসান: না ফেরার দেশে বেগম খালেদা জিয়া | Khaleda Zia Dies at 80: End of an Era in Bangladesh Politics
তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেমে এসেছে গভীর শোক। দীর্ঘ অসুস্থতার পর তার মৃত্যু দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগের সমাপ্তি টেনে দিল।

বাংলাদেশ রাজনীতির এক যুগের অবসান: না ফেরার দেশে বেগম খালেদা জিয়া | Khaleda Zia Dies at 80: End of an Era in Bangladesh Politics - Ajker Bishshow
বাংলাদেশের রাজনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (BNP) চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আজ ভোরে ৮০ বছর বয়সে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। হাসপাতালের চিকিৎসা ও পারিবারিক সূত্রে খবর পাওয়া গেছে যে ভোর ৬টা নাগাদ তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, দৈনিক সূর্যের আলো ফুটার প্রাক্কালে।
কেবল বাংলাদেশের নয় — আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, রইটার্স, এপি নিউজ, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালসহ বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমগুলোও খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে এবং তাকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেত্রী হিসাবেও অভিহিত করেছে।
অসুস্থতার দীর্ঘ লড়াই: মৃত্যুর পূর্বের দিনগুলি
বেগম খালেদা জিয়া এর দীর্ঘদিনের অসুস্থতার খবর বহুল প্রচারিত ছিল। তিনি সার্বিকভাবে বহু জটিল রোগে আক্রান্ত ছিলেন, যার মধ্যে লিভারের সিরোসিস, আর্থারাইটিস, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং ফুসফুসের অসুখ ছিল উল্লেখযোগ্য। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং তাকে অবশেষে চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয় ICU-তে।
তার জীবনাবসানে থাকা চিকিৎসকরা বলেছিলেন যে তার শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর কার্যকারিতা ক্রমিকভাবে খারাপ হচ্ছিল এবং চিকিৎসা কার্যক্রম সীমাবদ্ধ ছিল। বিদেশে নেওয়ার প্রচেষ্টা ছিল, কিন্তু তার শারীরিক অবস্থার কারণে তা সম্ভব হয়নি।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন: সংগ্রাম, ক্ষমতা ও বিতর্ক
খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় ধরে দাপটের সঙ্গে অংশ নিয়েছেন এবং দেশজুড়ে রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর অমোঘ প্রভাব রেখেছেন। তার রাজনৈতিক জীবন একদিকে সংগ্রাম ও অর্জনের গল্প, অন্যদিকে বিতর্ক ও কঠিন বিরোধিতার প্রতিচ্ছবি।
ঘরবধূ থেকে জাতীয় নেতৃত্ব
খালেদা জিয়া কর্মজীবন শুরু করেন স্বামী জিয়াউর রহমান এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে। ১৯৮১ সালে স্বামী হত্যার পর তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং দ্রুত বিএনপি-র নেতৃত্বে এসে গ্লানি গড়েন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরুটা ছিল প্রতিকূল পরিবেশের মোকাবিলা করতে করতে।
তিনবারের প্রধানমন্ত্রী
যুদ্ধপরবর্তী বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচনে প্রথমবার ১৯৯১ সালে নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া। ১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি দেশ সরকারের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর এই টানা কার্যকালের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একজন শক্তিশালী নারীতান্ত্রিক নেতৃত্ব হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেন।
বিরোধ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা
খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে শেখ হাসিনার সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। এই দুই নেত্রীকে প্রায়শই “দ্বন্দ্বমান বেগম” হিসেবে অভিহিত করা হয়, যাদের বিরোধিতার ফলে দেশজুড়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা, অবরোধ ও সহিংসতায় সাময়িক অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে।
হিংসা ও অবস্থান সংকট
রাজনৈতিক জীবনে তিনি বহুবার ক্ষমতার পতন, বিরোধী দলীয় চ্যালেঞ্জ, মামলা ও বন্দিদশা সহ্য করেছেন। ২০০৭ সালের জাতীয় রাজনৈতিক সংকটে গ্রেপ্তার ও কারাবাসের মধ্য দিয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ সম্মুখীন হন। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক রাজপথকে আরও তীক্ষ্ণ করে তোলে।
সাম্প্রতিক বছরগুলো
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তার রাজনৈতিক কার্যক্রম সীমিত হলেও তিনি BNP-র চেয়ারম্যান হিসেবে দলের নেতৃত্ব ধরে রেখেছেন এবং ২০২৫ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের প্রস্তুতিকে জোরদার করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন।
জাতীয় প্রতিক্রিয়া ও শোক প্রকাশ
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে BNP কর্তৃত্বকারী শোক ঘোষণা করেছে এবং ৭ দিনের শোক কাল ঘোষণা করেছে যেখানে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে শোক বই রাখা হবে ও নেতারা শোকচিহ্ন ধারণ করবেন।
একইভাবে, অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান উপদেষ্টা (Chief Adviser) অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং রাষ্ট্রের এক “মহৎ রক্ষকের” মৃত্যু হিসাবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন যে খালেদা জিয়ার অবদান বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গঠনে ছিল অনন্য এবং তিনি দীর্ঘকাল ধরে এই সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন দেশ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও শোক জানিয়েছেন। চীনের প্রধানমন্ত্রী ভীষণ দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং খালেদা জিয়ার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে উল্লেখ করেছেন।
তারেক রহমান ও BNP-র ভবিষ্যৎ
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর এক পর্যায়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে বিএনপি-র নেতৃত্ব এখন তারেক রহমান-এর হাতে আরও সুসংহতভাবে কেন্দ্রীভূত হবে। তারেক দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে ছিলেন এবং দেশে ফিরে নতুন দিকনির্দেশনা ও নেতৃত্ব যুগে BNP-কে নতুন করে সাজানোর দায়িত্ব নিতে পারেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপি-র নেতৃত্ব ও দলীয় নীতি পূর্বের মতো অটল থাকার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে কারণ রাজনীতিতে নেতাকেন্দ্রিকতা Historically তার উপস্থিতিই দলকে দৃঢ় করেছে। (এ বিষয়ে স্বাধীন বিশ্লেষণটি প্রতিবেদনের শেষে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে)
বাংলাদেশ রাজনীতির এক অধ্যায়ের উন্মেষ
বেগম খালেদা জিয়া শুধু একজন রাজনীতিক নন; তিনি বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতির এক প্রাণবন্ত চরিত্র ও ইতিহাসের অংশ। তিনবার প্রধানমন্ত্রী, রাজনৈতিক সংগ্রাম, বন্দিত্ব, ক্ষমতা হস্তান্তর, বিরোধিতা ও দেশে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রতি তাঁর অবদান জাতীয় রাজনীতিকে গতিশীল ও তীক্ষ্ণ করেছে।
তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি যুগের সমাপ্তি ঘটে; একই সাথে একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক মহলে এই দিনটিকে স্মরণ করা হবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক জীবনে এক সংযোগবিন্দু হিসেবে।
সম্পূরক পর্যালোচনা (Independent analysis):
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপি-র রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে কেন্দ্র করে বহু প্রশ্নও উঠেছে। দীর্ঘ কালের বিরোধিতা ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ক্ষমতায় দলের অবস্থান, শক্তি কেন্দ্রের পরিবর্তন, নতুন প্রজন্মের নেতা তৈরির প্রয়াস — এই সব বিষয় এখনো প্রকাশ্যে প্রাসঙ্গিক। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, খালেদা জিয়ার মতো একক নেত্রীত্বের পর BNP এখন দলীয় স্থিতিশীলতা ও নীতি নির্ধারণে বিভিন্ন সমন্বয়ের লক্ষ্য রাখবে, যাতে রাজনীতিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের ইতিহাসে একটি মোড়ঘট এবং ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপকে নতুনভাবে পরিমাপ করতে হবে।
Related Posts
View All
ঢাকা–করাচি সরাসরি ফ্লাইট: বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন যুগের সূচনা | Dhaka-Karachi direct flight: The beginning of a new era in Bangladesh's foreign policy
দীর্ঘ এক দশকের বিরতির পর আবার চালু হতে যাচ্ছে ঢাকা–করাচি সরাসরি ফ্লাইট। এই সিদ্ধান্তকে নিছক বিমান যোগাযোগ নয়, বরং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি বড় কৌশলগত পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা সম্পন্ন: রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন সম্পূর্ণ | Khaleda Zia Laid to Rest with State Honours in Dhaka
রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা ঢাকায় সম্পন্ন হয়েছে। হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় অনুষ্ঠিত জানাজার পর তাকে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পাশে দাফন করা হয়। দেশজুড়ে রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হচ্ছে।







