ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যু: রাজনৈতিক অঙ্গনে শোক ও নানা প্রশ্ন | Inqilab Mancha Spokesperson Sharif Osman Hadi Dies, Political Circles Mourn
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তাঁর আকস্মিক প্রয়াণ ঘিরে সমর্থক, সহকর্মী ও বিভিন্ন মহলে তৈরি হয়েছে গভীর শোক ও নানা প্রশ্ন।

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যু: রাজনৈতিক অঙ্গনে শোক ও নানা প্রশ্ন | Inqilab Mancha Spokesperson Sharif Osman Hadi Dies, Political Circles Mourn - Ajker Bishshow
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেমে আসে গভীর শোক ও উত্তেজনা—যখন সিঙ্গাপুর থেকে আসে এক হৃদয়বিদারক সংবাদ।
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ২০২৪ আন্দোলনের পরিচিত মুখ শরীফ ওসমান হাদি আর নেই।
গতকাল রাতে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাথায় গুলিবিদ্ধ ঘটনায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ত্রিশের কোঠায়। মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় দেশের রাজনৈতিক আবহ—শোক, ক্ষোভ ও প্রতিবাদের বিস্ফোরণে উত্তাল হয়ে ওঠে রাজপথ।
এই মৃত্যু শুধু একটি রাজনৈতিক নেতার নয়—অনেকের চোখে এটি একটি গণআন্দোলনের কণ্ঠস্বরকে নীরব করে দেওয়ার ঘটনা।
যেভাবে মাথায় গুলিবিদ্ধ হন ওসমান হাদি
ঘটনার সূত্রপাত ১২ ডিসেম্বর।
ঢাকার কেন্দ্রস্থল এলাকায়, দিনের আলোয়, প্রকাশ্য রাস্তায়—মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদিকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান,
গুলি সরাসরি তাঁর মাথায় লাগে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে রক্তাক্ত অবস্থায় জ্ঞান হারান। হামলার ধরন ও সময় দেখে সবাই একে টার্গেট কিলিং হিসেবে অভিহিত করেন এবং শুটার ও তার সহযোগী ভারতে পালিয়ে যায়।
ঘটনাস্থলেই তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। সহকর্মীরা দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান।
ঢাকায় চিকিৎসা ও সংকটজনক অবস্থা
ঢাকা মেডিকেলে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা জানান—
গুলিটি মাথার গুরুত্বপূর্ণ অংশে আঘাত করেছে। অবস্থা চরম সংকটজনক।
পরবর্তীতে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে একাধিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তাঁর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন।
কিন্তু সবার মুখেই ছিল একই কথা—
এই ধরনের মাথার আঘাতে বিদেশে উন্নত নিউরো সার্জারি ছাড়া বাঁচার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।
সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয় এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে
পরিবার ও সহকর্মীদের সিদ্ধান্তে, ১৫ ডিসেম্বর
শরীফ ওসমান হাদিকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়।
সেখানে তাঁকে ভর্তি করা হয় একটি আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতালে। আইসিইউতে রেখে নিউরো সার্জনদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা শুরু হয়।
হাসপাতাল সূত্র জানায়—
তিনি দীর্ঘ সময় লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। একাধিক অস্ত্রোপচারের চেষ্টা করা হলেও মাথার ভেতরের রক্তক্ষরণ ও স্নায়বিক ক্ষতি ছিল মারাত্মক।
শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর ঘোষণা
সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে
১৮ ডিসেম্বর রাত ৯.৩০ এর দিকে
সিঙ্গাপুরের হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুর ঘোষণা দেয়।
খবরটি প্রথম জানানো হয় তাঁর পরিবার, বাংলাদেশ এর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস, ও ইনকিলাব মঞ্চের শীর্ষ নেতৃত্বকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ইনকিলাব মঞ্চ এক বিবৃতিতে জানায়—
“আমাদের মুখপাত্র, আমাদের সহযোদ্ধা শরীফ ওসমান হাদি শহীদ হয়েছেন।”
রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা
শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায়
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস
দেশে রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেন।
ঘোষণা অনুযায়ী—
- সরকারি ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত
- বিশেষ দোয়া ও প্রার্থনার আয়োজন
- রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক পালন
ড. ইউনুস বলেন,
“এই মৃত্যু জাতির জন্য গভীর বেদনার। সহিংসতা ও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
দেশজুড়ে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ
মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই
ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়।
রাস্তায় নামে লাখো মানুষ।
শোনা যায়—
- হত্যার বিচার চাই
- ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদ
- বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ
বিক্ষোভে অনেক জায়গায় ভারতবিরোধী স্লোগানও ওঠে, যেখানে বিক্ষোভকারীরা দাবি করেন—
এই হত্যার পেছনে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র রয়েছে।
যদিও এসব অভিযোগ এখনো আনুষ্ঠানিক তদন্তে প্রমাণিত নয়, তবে জনরোষের মাত্রা স্পষ্ট।
রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব
শরীফ ওসমান হাদি ছিলেন
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও সমন্বয়ক।
২০২৪–২৫ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতায় তিনি হয়ে ওঠেন—
- তরুণদের কণ্ঠ
- রাজপথের মুখ
- সরকারের কঠোর সমালোচক
তিনি বক্তৃতা, সংবাদ সম্মেলন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব ছিলেন।
সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন সাহসের প্রতীক,
সমালোচকদের কাছে বিতর্কিত কিন্তু প্রভাবশালী।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর
শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যু নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে—
- BBC
- Reuters
- AP
- Economic Times
- Al Jazeera–সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম
তারা বলছে—
এই মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় পরীক্ষা।
পরিশেষে, একটি মৃত্যু, বহু প্রশ্ন
মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যু
বাংলাদেশকে দাঁড় করিয়েছে এক কঠিন প্রশ্নের মুখে—
- এই হত্যার পেছনে কারা?
- বিচার হবে তো?
- রাজনৈতিক সহিংসতার এই চক্র থামবে কবে?
- পরবর্তী টার্গেট কে?
একটি বিষয় নিশ্চিত—
শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যু শুধু একটি জীবনাবসান নয়, এটি একটি রাজনৈতিক মোড়।
বাংলাদেশ কি পারবে এই শহীদদের রক্তের সঠিক দাম দিতে?
Related Posts
View All
ঢাকা–করাচি সরাসরি ফ্লাইট: বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন যুগের সূচনা | Dhaka-Karachi direct flight: The beginning of a new era in Bangladesh's foreign policy
দীর্ঘ এক দশকের বিরতির পর আবার চালু হতে যাচ্ছে ঢাকা–করাচি সরাসরি ফ্লাইট। এই সিদ্ধান্তকে নিছক বিমান যোগাযোগ নয়, বরং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি বড় কৌশলগত পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা সম্পন্ন: রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন সম্পূর্ণ | Khaleda Zia Laid to Rest with State Honours in Dhaka
রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা ঢাকায় সম্পন্ন হয়েছে। হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় অনুষ্ঠিত জানাজার পর তাকে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পাশে দাফন করা হয়। দেশজুড়ে রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ রাজনীতির এক যুগের অবসান: না ফেরার দেশে বেগম খালেদা জিয়া | Khaleda Zia Dies at 80: End of an Era in Bangladesh Politics
তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেমে এসেছে গভীর শোক। দীর্ঘ অসুস্থতার পর তার মৃত্যু দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগের সমাপ্তি টেনে দিল।







