২১ নভেম্বর ২০২৫ এর ভূমিকম্প: বাংলাদেশে ১০ জন নিহত, ৬০০ আহত – পূর্ণ নিরাপত্তা নির্দেশিকা
২১ নভেম্বর ২০২৫ বাংলাদেশের ভূমিকম্পে ১০ জন নিহত ও ৬০০ জন আহত হয়েছেন। এই প্রতিবেদনে জানুন ভূমিকম্পের সময় কী করা উচিত, কীভাবে নিরাপদে থাকা যায় এবং পরে কী সতর্কতা মেনে চলা প্রয়োজন।

২১ নভেম্বর ২০২৫ এর ভূমিকম্প: বাংলাদেশে ১০ জন নিহত, ৬০০ আহত – পূর্ণ নিরাপত্তা নির্দেশিকা - Ajker Bishshow
২১ নভেম্বর ২০২৫, বৃহস্পতিবার। সকাল ৯টা ২২ মিনিটের সময় আকস্মিকভাবে সারা বাংলাদেশ বেশ জোরে কেঁপে ওঠে। মাত্র ২০–২৫ সেকেন্ডের সেই কম্পনই পুরো দেশকে আতঙ্কে ফেলে দেয়। রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জসহ প্রায় সব জেলাতেই তা অনুভূত হয়। ভূমিকম্পের কেন্দ্রবিন্দু ছিল দেশের মধ্যাঞ্চল, তাই ক্ষতিও অধিক হয় জনবহুল এলাকা ও পুরোনো স্থাপনার মধ্যে।
সরকার ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, এই ভূমিকম্পে সারাদেশে মোট ১০ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৬০০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। আহতদের অনেকেই ভবনের ভাঙা অংশ, কাঁচের টুকরা, সিঁড়িতে ভিড় এবং আতঙ্কে দৌড়ানোর কারণে আঘাত পেয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন—যদিও কম্পনের মাত্রা খুব বড় ছিল না, কিন্তু মানুষের অপ্রস্তুতি এবং পুরোনো অবকাঠামোর কারণে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে।
ঢাকায় পরিস্থিতি: ৪ জনের মৃত্যু, শতাধিক আহত
রাজধানী ঢাকাতেই সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক দেখা যায়। কম্পন শুরু হওয়া মাত্র হাজারো মানুষ ভবন থেকে দৌড়ে নিচে নেমে আসতে থাকে। এতে কয়েকটি স্থানে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। পুরোনো ঢাকার কয়েকটি ভবনের দেয়ালে বড় ফাটল দেখা গেছে, কিছু জায়গায় কাঁচের জানালা ভেঙে পড়ে।
ঢাকায় ৪ জন মারা গেছেন, যাদের মধ্যে দুইজন ভবন থেকে নেমে আসার সময় পড়ে গিয়ে, একজন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে এবং আরেকজন পুরোনো দেয়াল ধসে আহত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। শহরের বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ১৫০-এর বেশি আহত ব্যক্তি চিকিৎসা নিয়েছেন।
নরসিংদিতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু: ৫ জন নিহত
নরসিংদির সবুজবাগ, ব্রাহ্মন্দী ও মাধবদীর কয়েকটি এলাকায় পুরোনো ভবনের দেয়াল ও করিডোর ভেঙে পড়ায় একাধিক মানুষ আহত হন। এখানেই সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঘটে—৫ জন প্রাণ হারান, যারা মূলত ধসে পড়া অংশের নিচে চাপা পড়েন বা দৌড়ানোর সময় আঘাত পান।
নারায়ণগঞ্জে ১ জন নিহত
নারায়ণগঞ্জ শহরের পশ্চিম অংশে একটি দোতলা ভবনের বারান্দার অংশ ভেঙে নিচে পড়লে এক পথচারী নিহত হন এবং কয়েকজন আহত হন। শিল্পাঞ্চল হওয়ায় এলাকার অনেক কারখানায় কাজ বন্ধ হয়ে যায়, শ্রমিকরা আতঙ্কে বাইরে বেরিয়ে আসেন।
৬০০ জন আহত—আতঙ্কই বড় কারণ
আহতের সংখ্যা ৬০০ ছাড়িয়েছে। অধিকাংশই—
- সিঁড়িতে হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে
- কাঁচ ভেঙে পড়ায়
- দেয়ালের অংশ বা সাইনবোর্ড পড়ে
- দৌড়াদৌড়ির সময় পড়ে গিয়ে
- মাথায় আঘাত পেয়ে
চিকিৎসাধীন আছেন।
ডাক্তাররা জানিয়েছেন—“আতঙ্কে মানুষ ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ায় আঘাতের ঘটনা বাড়ে।”
ভবনগুলোর ক্ষতি
ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায়—
- ভবনের দেয়ালে বড় ফাটল
- প্লাস্টার খসে পড়া
- কাঁচ ভেঙে ছড়িয়ে থাকা
- সিঁড়ি ও দেয়ালের দুর্গন্ধযুক্ত ক্ষয়
- পুরোনো ভবনের পিলারে ফাটল
এসব চিহ্ন দেখা গেছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রায় ৩০টির বেশি ভবন পরিদর্শনের তালিকায় রাখা হয়েছে।
মানুষের আতঙ্ক: সমস্যার মূল উৎস
বিশেষজ্ঞরা বলছেন—ভূমিকম্পের কম্পন ছিল মাঝারি মাত্রার, কিন্তু ক্ষয়ক্ষতির উচ্চমাত্রার মূল কারণ হচ্ছে—
১. মানুষ প্রস্তুত নয়
ঢাকার অধিকাংশ মানুষ কোন পরিস্থিতিতে কী করবে—তা জানেন না।
২. পুরোনো ভবন
দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় সামান্য কম্পনেও বড় ক্ষতি হয়।
৩. আতঙ্কে দৌড়ানো
ভূমিকম্পের সময়ে মৃত্যুর সবচেয়ে বড় কারণ—দৌড়ানো বা সিঁড়িতে ভিড়।
৪. সংকীর্ণ রাস্তা
উদ্ধার অভিযান ধীর হয়।
একটি ছোট কম্পনে এত ক্ষতি—কারণ কী?
বাংলাদেশ তিনটি টেকটনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। ভূমিকম্পের ঝুঁকি এখানে সবসময়ই বেশি।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন—
- ঢাকার অবকাঠামো ভূমিকম্প সহনশীল নয়
- পুরোনো ভবনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ
- গ্যাস লাইন ও তারের জটিল সিস্টেম রয়েছে
- উদ্ধার ব্যবস্থা ধীর
এ কারণে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পেও বড় ক্ষতি হতে পারে।
২১ নভেম্বরের ভূমিকম্প আমাদের কী শিক্ষা দেয়
এই ভূমিকম্প আমাদের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে:
১. আমাদের প্রস্তুতি নেই
সরকারি-বেসরকারি উভয় পর্যায়ে ভূমিকম্প মোকাবিলার প্রস্তুতি আরও বাড়ানো দরকার।
২. সচেতনতা কম
মানুষ জানে না ভূমিকম্পের সময় কী করা উচিত—ফলে ছোট ভুল বড় বিপদে রূপ নেয়।
⭐ এখন আসি—ভূমিকম্পের সময় কী করবেন?
সহজ ভাষায় করণীয়গুলো নিচে দেওয়া হলো।
ভূমিকম্পের সময় করণীয় তালিকা
১. প্রথম ৫ সেকেন্ড: শান্ত থাকুন
ভয় পাবেন না। গভীর শ্বাস নিন। আতঙ্কই সবচেয়ে ক্ষতিকর।
২. Drop – Cover – Hold পদ্ধতি অনুসরণ করুন
Drop – মাটিতে নিচু হয়ে বসুন
ভারসাম্য রাখতে সাহায্য করে।
Cover – মাথা ও ঘাড় ঢেকে রাখুন
টেবিলের নিচে যান। কিছু না থাকলে হাত দিয়ে ঢেকে নিন।
Hold – শক্ত করে ধরে থাকুন
টেবিল সরলে সাথে সরুন।
ঘরের ভিতরে থাকলে করণীয়
- বাইরে দৌড়াবেন না
- জানালার কাছে যাবেন না
- গ্যাস চুলা বন্ধ রাখুন
- দরজার নিচে দাঁড়াবেন না
- টেবিল বা মজবুত কিছুতে আশ্রয় নিন
বাইরে থাকলে করণীয়
- খোলা জায়গায় যান
- ভবন, গাছ, বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে দূরে থাকুন
- দোকানের কাঁচের শো-রুম থেকে দূরে থাকুন
- ফ্লাইওভার বা সেতুর নিচে দাঁড়াবেন না
গাড়িতে থাকলে
- গাড়ি থামিয়ে ভিতরে থাকুন
- সেতু বা উঁচু স্থাপনা থেকে দূরে থাকুন
ভূমিকম্প থেমে গেলে করণীয়
- সিঁড়ি দিয়ে ধীরে নিচে নামুন
- গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি বন্ধ করুন
- ভবনে বড় ফাটল থাকলে ঢুকবেন না
- আফটারশকের জন্য প্রস্তুত থাকুন
- গুজব ছড়াবেন না, গুজবে বিশ্বাস করবেন না
জরুরি ব্যাগ সবসময় প্রস্তুত রাখুন
- টর্চ
- পাওয়ার ব্যাংক
- ওষুধ
- ফার্স্ট এইড
- শুকনো খাবার
- বোতলজাত পানি
- নগদ টাকা
- গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র
বাংলাদেশে ভূমিকম্প ঝুঁকি কেন বাড়ছে?
বাংলাদেশ তিনটি প্রধান টেকটনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন—
- ঢাকার ভবনগুলি অনেকটাই অ-ভূমিকম্প সহনশীল
- ঘনবসতি ও সংকীর্ণ রাস্তা উদ্ধারকাজকে কঠিন করে
- পুরোনো ভবন যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে
তাই সচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
শেষ কথা
ভূমিকম্প হঠাৎ আসে, কিন্তু প্রস্তুতি ধীরে ধীরে তৈরি হয়।
আপনি, আপনার পরিবার এবং সমাজ যদি আগে থেকেই জানেন কী করা উচিত—তাহলে একটি বড় বিপর্যয়ও সহজে সামলানো যায়।
জীবন বাঁচানোর জন্য নিয়মগুলো মনে রাখুন:
✔ DROP
✔ COVER
✔ HOLD
শান্ত থাকুন, সচেতন থাকুন—এটাই সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা।
Related Posts
View All
ঢাকা–করাচি সরাসরি ফ্লাইট: বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন যুগের সূচনা | Dhaka-Karachi direct flight: The beginning of a new era in Bangladesh's foreign policy
দীর্ঘ এক দশকের বিরতির পর আবার চালু হতে যাচ্ছে ঢাকা–করাচি সরাসরি ফ্লাইট। এই সিদ্ধান্তকে নিছক বিমান যোগাযোগ নয়, বরং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি বড় কৌশলগত পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা সম্পন্ন: রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন সম্পূর্ণ | Khaleda Zia Laid to Rest with State Honours in Dhaka
রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা ঢাকায় সম্পন্ন হয়েছে। হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় অনুষ্ঠিত জানাজার পর তাকে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পাশে দাফন করা হয়। দেশজুড়ে রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ রাজনীতির এক যুগের অবসান: না ফেরার দেশে বেগম খালেদা জিয়া | Khaleda Zia Dies at 80: End of an Era in Bangladesh Politics
তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেমে এসেছে গভীর শোক। দীর্ঘ অসুস্থতার পর তার মৃত্যু দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগের সমাপ্তি টেনে দিল।








