ইরান কেন কানাডার নৌবাহিনীকে “সন্ত্রাসী সংগঠন” ঘোষণা করল? | Why Iran Declared Canada’s Navy a Terrorist Organization: Key Reasons Explained
ইরান কেন হঠাৎ করে কানাডার নৌবাহিনীকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ ঘোষণা করল—এই প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। IRGC ইস্যু, দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক বৈরিতা এবং পাল্টা প্রতিক্রিয়ার রাজনীতিই এই সিদ্ধান্তের মূল ভিত্তি।

ইরান কেন কানাডার নৌবাহিনীকে “সন্ত্রাসী সংগঠন” ঘোষণা করল? | Why Iran Declared Canada’s Navy a Terrorist Organization: Key Reasons Explained - Ajker Bishshow
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে একটি বিবৃতিতে জানায় যে তারা কানাডার নৌবাহিনীকে “সন্ত্রাসী সংগঠন” হিসেবে ঘোষণা করছে। বিবৃতিতে বলা হয়, এটি একটি “পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া” — অর্থাৎ কানাডা যখন ইরানের সেনাবাহিনীর একটি শাখা IRGC-কে সন্ত্রাসী ঘোষণা করেছিল, তখন ইরানও সমপরিমাণ প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে।
ইরান সরকার এই পদক্ষেপটিকে আইন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তিতে ন্যায্য বলে অভিহিত করেছে, যদিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কোনো স্বীকৃতি বা বাস্তব প্রভাব এখন পর্যন্ত স্পষ্ট হয়নি।
প্রেক্ষাপট: IRGC ও কানাডার সিদ্ধান্ত
IRGC কি?
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সশস্ত্র বাহিনী। এটি ইরানের সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর একটি পরিচ্ছিন্ন শাখা, যা বিপুল রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক ক্ষমতা ধারণ করে।
কানাডার সিদ্ধান্ত: IRGC-কে সন্ত্রাসী হিসেবে ঘোষণার কারণ
২০১৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র IRGC-কে “বিদেশী সন্ত্রাসী সংগঠন” (Foreign Terrorist Organization) ঘোষণা করেছিল, এবং ২০২৪ সালের ১৯ জুন কানাডাও IRGC-কে একইভাবে আফেরতভাবে কানাডার সন্ত্রাসী সংস্থা হিসেবে তালিকাভুক্ত করে।
কানাডার এই সিদ্ধান্তের পেছনে প্রধান কারণগুলো ছিল:
- মানবাধিকার লঙ্ঘন: কানাডা দাবী করে যে IRGC ইরানের অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত কর্মকাণ্ডে মানবাধিকারের প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন করেছে। T
- আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে বিঘ্নিত করা: IRGC-কে কানাডা ও তার মিত্ররা এমন একটি শক্তি হিসেবে দেখে যা মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক শান্তি কাঠামোয় গোলযোগ সৃষ্টি করে।
- PS752 বিমান ঘটনা: ২০২০ সালের জানুয়ারিতে তেহরানে ইউক্রেন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট PS752 ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র দ্বারা ভুলক্রমে নামিয়ে ফেলা হয়েছিল, যাতে ১৭৬ জন নিহত হন, তাদের মধ্যে ৮৫ জন কানাডার নাগরিক ও স্থায়ী বসবাসকারী। এই ঘটনাটি কানাডার IRGC-কে সন্ত্রাসী তালিকাভুক্তির পেছনে একটি মূল প্রেক্ষাপট হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই সব কারণে কানাডার সরকার IRGC-কে সন্ত্রাসী বোঝায় এবং এর বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেয়।
ইরানের আইন: Reciprocal Action
ইরান ২০১৯ সালে একটি আইন পাশ করে যার নাম “Reciprocal Action Against the Designation of the Islamic Revolutionary Guard Corps as a Terrorist Organization”। এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল:
- যদি কোনো দেশ IRGC-কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে বা ইউএস-এর পদক্ষেপকে অনুসরণ করে, তাহলে ইরান সেই দেশের বিরুদ্ধে পারস্পরিক (reciprocal) পদক্ষেপ নিতে পারবে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫-এর বিবৃতি অনুযায়ী, তারা এই আইনের Article 7-এর ভিত্তিতে কানাডা-কে লক্ষ্য করে এই ঘোষণা করেছে।
ইরানের যুক্তি ও যুক্তির ভিত্তি
আন্তর্জাতিক আইনের উপর অভিযোগ
ইরান দাবি করে যে কানাডার IRGC-কে সন্ত্রাসী হিসেবে ঘোষণা করা “আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতির বিরুদ্ধে” ছিল, কারণ IRGC ইরানের সরকার ও সশস্ত্র বাহিনীর আইনি ও সাংবিধানিক অংশ।
ইরান মনে করে যে কোনো প্রজাতন্ত্রের নিয়মিত সেনাবাহিনীকে সন্ত্রাসী বলা উচিত নয়, এবং এটি সার্বভৌম অুণাধিকার ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নীতির লঙ্ঘন।
প্রতিক্রিয়ার ন্যায্যতা
ইরান আরও যুক্তি দেয় যে তাদের পদক্ষেপটি একেবারেই প্রতিক্রিয়ামূলক (tit-for-tat) এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ধারায় স্বাভাবিক। তারা দাবি করে যে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও নিরাপত্তার প্রেক্ষাপটে এটি ন্যায্য প্রতিক্রিয়া।
এই ন্যায্যতা দাবি—যেখানে তারা মনে করে কানাডার সিদ্ধান্ত শুধু রাজনৈতিক এবং পক্ষপাতিত্বপূর্ণ—ইরানের প্রেক্ষাপট ও নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিফলিত করে।
কানাডা-ইরান সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক টানাপোড়েন
ইরান ও কানাডার সম্পর্ক বহু বছর ধরে সঙ্ঘর্ষপূর্ণ ছিল। তাদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ের কারণে দূরত্ব ও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
২০১২-এর দূতাবাস বন্ধ
কানাডা ২০১২ সালে তেহরানে তার দূতাবাস বন্ধ করে দেয় এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্থগিত করে দেয়, ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম, আঞ্চলিক নীতিসহ অন্যান্য নিরাপত্তা ইস্যুর কারণে।
মানবাধিকার ও বিরোধী গোষ্ঠীগুলি
কানাডা ইরানকে মানবাধিকার লঙ্ঘন, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, ও সন্ত্রাস-সমর্থিত কার্যক্রমের বিষয়ে নিয়মিত সমালোচনা করেছে, এবং ইরান বিভিন্ন সময়ে কানাডার এই সমালোচনাকে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত বলে বিবেচনা করেছে।
এই দীর্ঘমেয়াদি টানাপোড়েন ২০২৪-২৫ সালের ঘটনাগুলোর মুল প্রেক্ষাপট।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও বাস্তব পরিণতি
বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই ঘোষণাকে প্রধানত প্রতিকূল কূটনৈতিক ইশারা হিসেবে দেখছে; তা আইনি বা বাস্তব প্রভাব — যেমন আটক, আরোপ, বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা — তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর নয়।
আইনি বাস্তবতা
আন্তর্জাতিক আইনে সাধারণত রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বাহিনীকে অন্যান্য দেশের সরকারের পক্ষ থেকে সন্ত্রাসী ঘোষণা করার মতো ধারা স্বীকৃত নয়, এবং আন্তর্জাতিক আদালত বা জাতিসংঘের মতো সংস্থা সাধারণত এই ধরনের ঘোষণা গ্রহণ করে না।
কূটনৈতিক ও সামরিক প্রভাব
এই ঘোষণার মাধ্যমে সম্ভাব্য প্রভাবগুলির মধ্যে রয়েছে:
- কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও খারাপ হওয়া
- সামরিক সহযোগিতার সম্ভাব্য বিঘ্ন
- ক্যানাডীয় নৌবাহিনীর আন্তর্জাতিক কার্যক্রমে প্রশাসনিক ও নিরাপত্তামূলক বাধা
- মধ্যপ্রাচ্য বা আন্তর্জাতিক জলসীমায় কাঁটাচামচ পরিস্থিতির সৃষ্টি (যদিও এখন পর্য্যন্ত পরিষ্কার বাস্তব প্রভাব নেই)
ইরান-কানাডা সম্পর্কের নতুন উত্তেজনা কেবল সাম্প্রতিক ইস্যু নয়; বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি দ্বিপাক্ষিক মনোভাব, ঐতিহাসিক অপরাধবোধ, নিরাপত্তাগত উদ্বেগ ও কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়ার ফল। কানাডার IRGC-কে সন্ত্রাসী ঘোষণা ও তার পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের সমমানের প্রত্যুত্তর — কানাডার নৌবাহিনীকে সন্ত্রাসী ঘোষণা — এই পুরো দ্বন্দ্বের একটি সতর্কতামূলক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
এই ধরনের কূটনৈতিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিলতা, নিরাপত্তা নীতিবিদ্যা এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থের সংঘর্ষের একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
Watch Video
Related Posts
View All
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভেতরের গল্প: সত্যিই কি পরমাণু বোমার পথে তেহরান? | Inside Iran’s Nuclear Program: Is Tehran Moving Toward a Nuclear Weapon?
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিতর্ক তুঙ্গে। এটি কি শুধুই বিদ্যুৎ ও চিকিৎসা গবেষণার জন্য, নাকি এর পেছনে রয়েছে গোপন সামরিক লক্ষ্য? Mehr News Agency-র রিপোর্ট অবলম্বনে ইরানের পরমাণু প্রকল্পের ভেতরের বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।

দক্ষিণ আফ্রিকা অভিযানে ইরানের নৌবহর – বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ইঙ্গিত! | Iranian Naval Expansion: South African Deployment Raises Global Eyebrows
ইরান সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্দেশে একাধিক নৌবহর পাঠিয়েছে। আন্তর্জাতিক জলসীমায় তাদের উপস্থিতি জোরদার করার এই পদক্ষেপ কেবল সামরিক নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতিতে ইরানের প্রভাব বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। জানুন বিস্তারিত ইরানি নৌ অভিযান, টাস্ক গ্রুপের সক্ষমতা এবং এর সম্ভাব্য প্রভাব।








