১৯৭৯ থেকে আজ পর্যন্ত ইরান: বিপ্লব, যুদ্ধ ও একের পর এক সংকটের ভয়ংকর টাইমলাইন | Iran Since 1979: A Timeline of Revolutions, Wars, Sanctions and Protests
১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর থেকে ইরান একের পর এক সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে—ইরাক যুদ্ধ, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, পারমাণবিক উত্তেজনা, গণবিক্ষোভ ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়। এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে বিপ্লব-পরবর্তী ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, সামাজিক ও ভূরাজনৈতিক সংকটগুলোর পূর্ণ টাইমলাইন।

১৯৭৯ থেকে আজ পর্যন্ত ইরান: বিপ্লব, যুদ্ধ ও একের পর এক সংকটের ভয়ংকর টাইমলাইন | Iran Since 1979: A Timeline of Revolutions, Wars, Sanctions and Protests - Ajker Bishshow
১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লব (Islamic Revolution) মধ্যপ্রাচ্যের আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মাইলফলক। এই বিপ্লবের পরে ইরান শুধু দেশের অভ্যন্তরেই নয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও ঘূর্ণিঝড়ের মতো ওঠানামা করেছে। বিপ্লবের পর থেকে আজ পর্যন্ত ইরান বিভিন্ন সংকট, যুদ্ধ, প্রতিবাদ, রাজনৈতিক বিরোধ, অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে। এই লেখায় আমরা ১৯৭৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ইরানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সংকটগুলোর একটি সময়রেখা উপস্থাপন করছি।
১৯৭৯: ইসলামিক বিপ্লব ও ক্ষমতার পরিবর্তন
১৯৭৮–৭৯ সালে শুরু হওয়া গণআন্দোলন শেষ পর্যন্ত মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলাভিকে ক্ষমতাচ্যুত করে দেয়। বিপ্লবের নেতা আয়াতোল্লাহ রুহোল্লাহ খোমেনি ফরাসি নির্বাসন থেকে দেশে ফিরে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করেন এবং চলতি বছরের এপ্রিল মাসে একটি গণমত সংগ্রহের মাধ্যমে ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়।
১৯৭৯–১৯৮১: যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস দাঙ্গা (হোস্টেজ ক্রাইসিস)
বিপ্লবের মাত্র কয়েক মাস পরই নভেম্বর ৪, ১৯৭৯ সালে ফিলাডেলফিয়া ভিত্তিক যুক্তরাষ্ট্রের তেহরান দূতাবাসে হামলা হয় এবং ৫২ জন আমেরিকান কুটনীতিককে ৪৪৪ দিন ধরে হোস্টেজ হিসেবে ধরে রাখা হয়। হোস্টেজ ক্রাইসিসের ফলে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক স্থায়ীভাবে শীতল হয়ে যায়।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক তীব্র সংকটে পড়ে এবং ইরানের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি প্রভাবিত হয়।
১৯৮০–৮৮: ইরাক–ইরান যুদ্ধ
১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বরে ইরাকের সাদ্দাম হুসেইনের নেতৃত্বে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধটি আট বছর স্থায়ী হয় এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারায় এবং দু’দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের পথে চলে যায়। ইরানি জনগণ এটি “পবিত্র প্রতিরক্ষা” হিসেবে অভিহিত করে।
এই দীর্ঘ ও প্রাণহানির যুদ্ধ ইরানের অর্থনৈতিক ও সামরিক খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে আরও কঠোর করে তোলে।
১৯৮১–৮২: অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দমনে হত্যাযজ্ঞ
ইরান–ইরাক যুদ্ধ চলাকালে অভ্যন্তরে বিরোধী দল ও বামপন্থী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও সরকারী দমন অভিযান চলে। ১৯৮১–৮২ সালে “ইরান হত্যাযজ্ঞ” নামে পরিচিত ওই সময়ে সরকার বিরোধী নেতারা, ইন্টেলেকচুয়াল এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের লোকদের বিরুদ্ধে ব্যাপক নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়।
এই সময়ে হাজার হাজার লোককে বিবেকবুদ্ধিবুদ্ধি দিয়ে হত্যা করা হয় এবং রাজনৈতিক অধিকার ও মত প্রকাশের পরিবেশ চরমভাবে সংকুচিত হয়।
১৯৯০-এর দশক: অর্থনৈতিক চাপ ও ক্ষুদ্র আন্দোলন
ইরাক–ইরান যুদ্ধ শেষে ইরান কিছুটা স্থিতিশীল হলেও দেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে সংকটে পড়ে। সরকারী সংস্কার ও গণতান্ত্রিক কর্মসূচির দাবিতে ১৯৯৯ সালে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। কিন্তু সরকার কঠোরভাবে এই আন্দোলন দমন করে।
২০০০ এবং ২০০৯: রাজনৈতিক আন্দোলন ও নির্বাচন বিতর্ক
২০০৯ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পরে বিরোধীরা অভিযোগ করে ফলাফল কারচুপি হয়েছে বলে একটি বৃহৎ “গ্রিন মুভমেন্ট” আন্দোলন আয়োজন করে। সরকার এই আন্দোলন কঠোরভাবে দমন করে এবং ইন্টারনেট ও সংবাদ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করে।
২০১২–২০১৮: পারমাণবিক বিষয়, নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক ঘাটতি
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করলে ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন শক্ত বাধ্যতামূলক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ২০১৫ সালে একটি অংশীদারিত্বমূলক জোরদার পারমাণবিক চুক্তি (JCPOA) স্বাক্ষরিত হয়, যা কিছু আর্থিক শিথিলতা প্রদান করে। কিন্তু ২০১৮ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে গেলে পুনরায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয় এবং ইরানের অর্থনীতি তীব্র মন্দার মুখে পড়ে।
এর ফলে রিয়াল মুদ্রার দাম হ্রাস পায়, আমদানি-রফতানি সংকট ও সাধারণ মানুষের জীবনে ব্যয় বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
২০২২–২০২৩: মহসা আমিনি আন্দোলন
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২২ সালে নাপাক “হিজাব আইন” পালন না করার অভিযোগে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া ২২ বছর বয়সী মহসা (জিনা) আমিনি নামে একজন নারীর মৃত্যুর পর ইরানজুড়ে একটি ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলনের স্লোগান ছিল “মহিলা, জীবন, স্বাধীনতা” (“Woman, Life, Freedom”) এবং এটি সমগ্র দেশের সর্ববৃহৎ বিক্ষোভগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে আবির্ভূত হয়।
সরকারি দমন পীড়নে শতাধিক মানুষ নিহত হয় এবং হাজার হাজার গ্রেফতার ও নিপীড়ন ঘটে। এই আন্দোলন ইরানের থিওক্র্যাটিক কাঠামোর সমালোচনা আরও তীব্র করে তোলে এবং বিশ্বব্যাপী ইরান সমর্থক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর চাপ বাড়ায়।
২০২৫–২০২৬: অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও নতুন ঢেউয়ের প্রতিবাদ
১৯ ডেসেম্বর ২০২৫ সালে ইরানে রিয়ালের দাম রেকর্ডমাত্রায় ভেঙে পড়ে; এক ডলারের জন্য ১.৩৮ মিলিয়ন রিয়াল পর্যন্ত নেমে আসে। এর ফলে দেশজুড়ে প্রধান শহরগুলোতে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়।
এই বিক্ষোভ প্রাথমিকভাবে অর্থনৈতিক ক্ষোভের সাথে শুরু হলেও দ্রুত রাজনৈতিক বিরোধ ও সরকারের নেতৃত্ববিরোধী দাবিতে বিকশিত হয়। বিক্ষোভ চলাকালীন ইন্টারনেট পুরো দেশ জুড়ে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও মৌলিক দ্রব্যের ঘাটতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবন ব্যাহত হয়, এবং সরকারের কঠোর দমন নীতি প্রতিটি শহরে দৃশ্যমান হয়।
সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুসারে, শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে, হাজারেরও বেশি গ্রেফতার হয়েছে, এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ চাপ বিশ্বব্যাপী নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি জটিল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরানের সংকটের মূল কারণ
উপরের ইতিহাস থেকে বোঝা যায় যে ইরানের সংকটের মূল কারণগুলো ছিল:
১. রাজনৈতিক কাঠামোর কঠোরতা – ধর্মীয় ও পেশাজীবী নেতাদের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা অনেক সময় গণতান্ত্রিক বা মাশাল আন্দোলনগুলোর সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটিয়েছে।
২. অর্থনৈতিক চাপ ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা – বহুমাত্রিক নিষেধাজ্ঞা ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক নীতির কারণে বাজারে স্থায়ী মন্দা সৃষ্টি হয়েছে।
৩. সামাজিক ও সংস্কৃতিক বিরোধ – ধর্মীয় বিধিনিষেধ ও নাগরিক অধিকারের সীমাবদ্ধতা সাধারণ মানুষের অসন্তোষ তৈরি করেছে।
৪. আন্তর্জাতিক গঠন ও উত্তেজনা – যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে অস্থিতিশীল সম্পর্ক ইরানের ওপর বহুমুখী চাপ সৃষ্টি করেছে।
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পরে ইরান শুধু একটি রাজনৈতিক নতুন পাঠ ভোগ করেনি, বরং তাকে বছরের পর বছর ধরে আন্তর্জাতিক যুদ্ধ, অভ্যন্তরীণ দমন, অর্থনৈতিক সংকট, এবং সামাজিক আন্দোলনের বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। ১৯৮০’র ইরাক–ইরান যুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২২–২৩ সালের মহসা আমিনি আন্দোলন, এবং সর্বশেষ ২০২৫–২৬ সালের বিস্তৃত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিক্ষোভ—সব মিলিয়ে ইরানের অভ্যন্তরীণ চাপ ও সংকট একটিমাত্র ধারাবাহিক গল্প বলে। এই গল্পটি রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে বিরোধ, আন্তর্জাতিক চাপ, এবং সামাজিক আকাঙ্ক্ষার একটি জটিল ছক তৈরি করেছে, যা সাম্প্রতিক সময়েও ইরানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও সামাজিক গতি নির্ধারণ করছে।
Related Posts
View All
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভেতরের গল্প: সত্যিই কি পরমাণু বোমার পথে তেহরান? | Inside Iran’s Nuclear Program: Is Tehran Moving Toward a Nuclear Weapon?
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিতর্ক তুঙ্গে। এটি কি শুধুই বিদ্যুৎ ও চিকিৎসা গবেষণার জন্য, নাকি এর পেছনে রয়েছে গোপন সামরিক লক্ষ্য? Mehr News Agency-র রিপোর্ট অবলম্বনে ইরানের পরমাণু প্রকল্পের ভেতরের বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।

ইরান কেন কানাডার নৌবাহিনীকে “সন্ত্রাসী সংগঠন” ঘোষণা করল? | Why Iran Declared Canada’s Navy a Terrorist Organization: Key Reasons Explained
ইরান কেন হঠাৎ করে কানাডার নৌবাহিনীকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ ঘোষণা করল—এই প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। IRGC ইস্যু, দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক বৈরিতা এবং পাল্টা প্রতিক্রিয়ার রাজনীতিই এই সিদ্ধান্তের মূল ভিত্তি।







