নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র জোহরান মামদানী: এক নতুন ইতিহাসের সূচনা | Zohran Mamdani: The Rise of New York’s First Muslim Mayor
উগান্ডায় জন্ম, ভারতীয় মায়ের সন্তান, আর এখন আমেরিকার সবচেয়ে বড় শহর নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম ও দক্ষিণ এশীয় মেয়র! জোহরান মামদানীর এই জয় শুধুই রাজনীতির নয়, এটি ইতিহাসেরও এক নতুন অধ্যায়।

নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র জোহরান মামদানী: এক নতুন ইতিহাসের সূচনা | Zohran Mamdani: The Rise of New York’s First Muslim Mayor - Ajker Bishshow
আমেরিকার ইতিহাসে এই প্রথম — নিউইয়র্ক সিটির মেয়র হলেন একজন মুসলিম। তাঁর নাম জোহরান মামদানী (Zohran Mamdani)।
এই নামটি এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, গোটা বিশ্বেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। কারণ, তাঁর জয় শুধু একটি নির্বাচনী ফল নয় — এটি আমেরিকান রাজনীতিতে পরিবর্তনের প্রতীক।
🌍 কে এই জোহরান মামদানী?
জোহরানের জন্ম আফ্রিকার উগান্ডায়। তাঁর বাবা মাহমুদ মামদানী একজন বিখ্যাত অধ্যাপক, আর মা মীরা নাইর হলেন আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা — The Namesake, Salaam Bombay–এর পরিচালক।
ছোটবেলাতেই তিনি পরিবারসহ যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসেন এবং পরে নিউইয়র্কেই বড় হন।
তরুণ বয়সে রাজনীতিতে নয়, তিনি ছিলেন সাধারণ এক সামাজিক কর্মী। ভাড়া বাড়ানো, চাকরির নিরাপত্তা, শিক্ষার সুযোগ — এসব সাধারণ মানুষের সমস্যা নিয়ে তিনি কাজ শুরু করেন।
সেখান থেকেই রাজনীতির পথে হাঁটা শুরু তাঁর।
🗳️ নির্বাচনে চমক
২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে নিউইয়র্ক সিটির নির্বাচনে ঘটে এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুয়োমো–এর মতো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে জোহরান মামদানী জয়ী হন।
তাঁর এই জয় যেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদেরও হতবাক করে দেয়। কারণ, বড় কোনো কর্পোরেট তহবিল বা রাজনৈতিক “গডফাদার” ছাড়াই তিনি জয় পান।
তাঁর প্রচারণা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী —
👉 সাধারণ মানুষের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে কথা বলা
👉 সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে তরুণদের সক্রিয় করা
👉 ছোট অনুদান (small donations) দিয়ে তহবিল গঠন করা
এই "গ্রাউন্ড লেভেল ক্যাম্পেইন"-টাই তাঁকে নিউইয়র্কের মানুষের কাছে সত্যিকার অর্থে জনপ্রিয় করে তোলে।
💬 তাঁর মূল বার্তা: মানুষের জন্য রাজনীতি
জোহরান মামদানীর নির্বাচনী স্লোগান ছিল —
“City for the People, Not for the Powerful.”
অর্থাৎ, “ক্ষমতাবানদের নয়, সাধারণ মানুষের শহর চাই।”
তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—
- ভাড়া বৃদ্ধির বিরুদ্ধে “Rent Freeze” কার্যকর করবেন
- নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ফ্রি বাস পরিষেবা চালু করবেন
- শহরের বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়াবেন
- ধনীদের ওপর অতিরিক্ত কর বসিয়ে সেই অর্থ সামাজিক উন্নয়নে ব্যবহার করবেন
এই বার্তাগুলো সাধারণ নিউইয়র্কবাসীর হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
🕌 ধর্ম, জাতি আর প্রতিনিধিত্বের নতুন ইতিহাস
নিউইয়র্ক আমেরিকার সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় শহর — এখানে মুসলিম, ইহুদি, খ্রিস্টান, হিন্দু—সব ধর্মের মানুষ বসবাস করে।
কিন্তু এত বছরেও কখনো কোনো মুসলিম বা দক্ষিণ এশীয় মানুষ মেয়র হননি।
জোহরান মামদানী সেই দীর্ঘ ইতিহাস ভেঙে দিয়েছেন।
তাঁর জয় অনেক তরুণ মুসলিম-আমেরিকান এবং দক্ষিণ এশীয় নাগরিকের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগিয়েছে।
বিশ্বজুড়েও তাঁর এই অর্জন এখন এক অনুপ্রেরণার প্রতীক।
⚖️ রাজনৈতিক পটভূমি ও বিতর্ক
জোহরান মামদানী নিজেকে Democratic Socialist হিসেবে পরিচয় দেন — অর্থাৎ এমন এক রাজনীতিক, যিনি ধনী-গরিব বৈষম্য কমাতে রাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকার পক্ষে।
এই কারণে মার্কিন রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণির অনেকেই তাঁকে সমালোচনা করেছেন।
নির্বাচনের সময় ইসলামবিরোধী ও বর্ণবাদী আক্রমণও হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
কিন্তু তিনি কখনো উত্তেজনায় না গিয়ে শান্তভাবে বলেছেন —
“আমি একজন মুসলিম, আমি একজন অভিবাসীর সন্তান, আর আমি এই শহরের ভবিষ্যতের জন্য লড়ছি।”
এই বক্তব্যই মানুষের মনে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা আরও বাড়িয়ে দেয়।
🌆 জয়ের প্রতিক্রিয়া
লন্ডনের মেয়র সাদিক খান, যিনি নিজেও মুসলিম, টুইট করে বলেন —
“Zohran’s victory is not just a local event. It’s a message of hope for millions.”
অন্যদিকে, আমেরিকার সংবাদমাধ্যমগুলো এই জয়কে “The New Face of Progressive America” বলে অভিহিত করেছে।
কারণ, এটি দেখিয়েছে যে আমেরিকার রাজনীতি এখন আগের মতো একমুখী নয় — নতুন প্রজন্মের নেতারাও সামনে আসছে।
🇧🇩 বাংলাদেশের জন্য কী শেখার আছে?
জোহরান মামদানীর গল্প শুধু আমেরিকার নয়, আমাদের মতো দেশগুলোর জন্যও একটি শিক্ষা।
- প্রতিনিধিত্ব গুরুত্বপূর্ণ:
- সমাজের প্রতিটি শ্রেণির মানুষকে রাজনীতিতে স্থান দিতে হবে। তবেই বাস্তব পরিবর্তন সম্ভব।
- যুব সমাজের শক্তি:
- সোশ্যাল মিডিয়া আর সংগঠিত তরুণরা এখন ভোটের ফলাফলও বদলে দিতে পারে।
- বক্তব্য নয়, বাস্তব সমাধান:
- মানুষ চায় এমন নেতা, যিনি তাদের জীবনের সমস্যার সমাধান দেবেন, শুধু বক্তৃতা নয়।
🚀 আগামী চ্যালেঞ্জ
এখন তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা —
এই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে রূপ দেওয়া।
নিউইয়র্কের মতো বিশাল শহর চালানো সহজ নয়। বাজেট সীমিত, রাজনীতি জটিল।
তবু অনেকেই আশা করছেন, এই তরুণ নেতা অন্তত নতুন একটা চিন্তার দরজা খুলে দিতে পারবেন।
🔚 উপসংহার
জোহরান মামদানীর এই জয় একদম অন্যরকম এক বার্তা দিচ্ছে —
ধর্ম, জাতি বা বংশ নয়; নেতৃত্বের আসল মানদণ্ড হলো সততা, সাহস আর মানুষের প্রতি ভালোবাসা।
উগান্ডার এক প্রবাসী পরিবার থেকে উঠে এসে নিউইয়র্কের মেয়র হওয়া — এটা প্রমাণ করে, সুযোগ দিলে ইতিহাস বদলাতে পারে একজন মানুষই।
তাঁর জয় শুধু নিউইয়র্কের নয়, বরং সমগ্র মুসলিম বিশ্বের জন্য গর্বের একটি মুহূর্ত।
Related Posts
View All
ইউরোপ কি যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া নিজেকে রক্ষা করতে পারবে? ন্যাটো প্রধানের কড়া বার্তা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা ছাড়া ইউরোপ নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে—এই ধারণাকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করলেন ন্যাটো মহাসচিব। তাঁর ‘গুড লাক’ মন্তব্য ইউরোপের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, ন্যাটোর ভবিষ্যৎ এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।

B-2 বোমারু থেকে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র: ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী হামলার সম্ভাব্য রূপরেখা |
B-2 স্টিলথ বোমারু বিমান ও টমাহক ক্রুজ মিসাইল—এই দুই অস্ত্রই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার হামলার পথে হাঁটে, তাহলে কীভাবে, কোন অস্ত্র দিয়ে এবং কোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে? এই প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সম্

নোবেল পুরস্কারের সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড দাবি জুড়লেন ট্রাম্প: নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো বার্তা ঘিরে তীব্র বিতর্ক | Trump Links Greenland Ambitions to Nobel Peace Prize in Message to Norway’s Prime Minister
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো এক বার্তায় গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তার আগ্রাসী অবস্থানকে নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার প্রসঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এই মন্তব্য ঘিরে ইউরোপ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।






