যুদ্ধ থামাতে বড় পদক্ষেপ: ট্রাম্প-জেলেনস্কি বৈঠক ঘিরে বিশ্ব রাজনীতিতে তোলপাড় | Zelensky to Meet Trump on Sunday: A Turning Point in the Russia-Ukraine War?
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। এই বৈঠককে যুদ্ধের সম্ভাব্য টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে দেখছে আন্তর্জাতিক মহল।

যুদ্ধ থামাতে বড় পদক্ষেপ: ট্রাম্প-জেলেনস্কি বৈঠক ঘিরে বিশ্ব রাজনীতিতে তোলপাড় | Zelensky to Meet Trump on Sunday: A Turning Point in the Russia-Ukraine War? - Ajker Bishshow
কাতারভিত্তিক আল জাজিরা, ওয়াশিংটন পোস্ট, রয়টার্স, এবিপি ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি আগামী রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো রিসোর্টে বৈঠক করবেন। এই বৈঠকটি হওয়ার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধান, নিরাপত্তা গ্যারান্টি, ও একটি ব্যাপক শান্তি পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা, যা প্রায় চার বছর ধরে চলমান এই সংঘাতকে অবসান ঘটাতে পারে।
জেলেনস্কি নিজেই শুক্রবার সংবাদ মাধ্যমে বলেছেন, “নতুন বছরের আগেই অনেক কিছু ঠিক হয়ে যেতে পারে,” এবং তিনি বলেছেন যে আলোচ্য ২০-দফা শান্তি পরিকল্পনা প্রায় ৯০ শতাংশ প্রস্তুত। তিনি জানান, ইউএস-এর সঙ্গে এই পরিকল্পনার নিরাপত্তা গ্যারান্টি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং অন্যান্য মূল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবেন।
এই বৈঠকটি শুধু ইউক্রেন ও মার্কিন সরকারের মধ্যে একটি দ্বিপক্ষীয় আলোচনা নয়; বরং ইউরোপীয় নেতাদেরও অংশগ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে ভার্চুয়াল মাধ্যমে, যাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভূমিকা বাড়ানো যায়। যদিও রাশিয়া সরাসরি এই বৈঠকে অংশ নিচ্ছে না, পরোক্ষভাবে জয়েন্ট ফ্রেমওয়ার্ক ও শান্তি পরিকল্পনার ওপর তাদের প্রতিক্রিয়া বিষয়টি আলোচ্য থাকবে।
কেন এই বৈঠক এখন? – যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রায় আগ্রাসন শুরু করে, যা এখন প্রায় তিন বছর পার করে প্রায় চার বছরের সংকটের কোপে পতিত। এই যুদ্ধ ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে মারাত্মক সংঘাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, এবং হাজার হাজার মৃত্যু, মানবিক বিপর্যয় ও অর্থনৈতিক ধ্বংসের প্রতিফলন ঘটিয়েছে।
এদিকে, যুদ্ধ এখনও থেমে নেই। শুক্রবার রাশিয়া আবারও কিয়েভে বিস্তৃত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়, যেখানে কমপক্ষে আটজন গুরতর আহত হয়। এই আকস্মিক হামলা ঠিক তখনই আসে যখন জেলেনস্কির সাথে ট্রাম্পের বৈঠক মাত্র একদিন দূরে ছিল। এই ঘটনা যুদ্ধের তীব্রতা ও শান্তি আলোচনা উভয়ের জটিল বাস্তবতা তুলে ধরে।
স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগ
শান্তি প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্রসমূহ এবং অন্যান্য দেশগুলো বিভিন্ন সময়ে মধ্যস্থতা প্রচেষ্টা চালিয়ে এসেছে। মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার সাম্প্রতিক আলোচনায় জেলেনস্কি বলেছিলেন যে আলোচনাগুলোতে “নতুন কিছু ধারণা” উঠে এসেছে যা শান্তির দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রস্তাব ছিল একটি অর্থনৈতিক মুক্ত অঞ্চল স্থাপনের পরিকল্পনা, যদি ইউক্রেন কিছু বিতর্কিত এলাকাগুলো ছেড়ে দিতে রাজি হয়। তবে এই প্রস্তাবের অনেক বিবরণ এখনও অস্পষ্ট ও বিতর্কিত। জেলেনস্কি স্পষ্টভাবে বলেছেন যে যেকোনো ভূখণ্ড ছাড়ার সিদ্ধান্ত ইউক্রেনিরাই করবে, সম্ভবত একটি গণভোটের মাধ্যমে।
ইউরোপীয় নেতাদের ইতোমধ্যে অংশগ্রহণের আগ্রহ রয়েছে, যদিও অনেকেই সরাসরি বৈঠকে উপস্থিত থাকতে পারছে না। বিভিন্ন মহলে ব্যাপক সমর্থন থাকলেও, রাশিয়ার অবস্থান এখনও কঠোর: তারা এখনও পূর্বাঞ্চলীয় ডনবাস ও জাপোরিজিয়া এলাকায় তাদের দাবি তুলছে, যা শান্তি আলোচনাকে জটিল করে তুলছে।
২০-দফা শান্তি পরিকল্পনা: কী আছে এতে?
এই পরিকল্পনা হলো একটি ব্যাপক কাঠামো, যার মূল উদ্দেশ্য যুদ্ধ থামানো, নিরাপত্তা গ্যারান্টি প্রদান, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতা নিশ্চিত করা। এতে অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো হলো:
১. নিরাপত্তা গ্যারান্টি
ইউক্রেন তার সীমান্ত ও সার্বভৌমতা রক্ষার জন্য কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়, বিশেষ করে রাশিয়ার সম্ভাব্য পুনরায় আগ্রাসন প্রতিরোধে। মার্কিন নিরাপত্তা গ্যারান্টি দীর্ঘমেয়াদি ও আইনি বাধ্যবাধক হতে হবে এমন দাবি রয়েছে ইউক্রেনের পক্ষ থেকে।
২. সামরিক সংঘাত স্থগিত ও আগুনবিদ্যুৎ বন্ধ
যুদ্ধের তীব্রতা কমাতে এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামরিক কর্মকাণ্ড স্থগিত করার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি ধীরে ধীরে একটি দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
৩. সীমান্ত ও জেলা নিয়ে সমঝোতা
ডনবাস ও জাপোরিজিয়া পারমাণবিক শক্তিস্থল বিষয়গুলো সবচেয়ে বিতর্কিত। ইউক্রেন ও রাশিয়ার পক্ষের বিভিন্ন দাবি থাকায় এই বিষয়গুলোর সমাধান ছাড়া শান্তি সম্ভব নয়। তাই এই অংশগুলো বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয়।
৪. অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও আন্তর্জাতিক সহায়তা
যুদ্ধ পরবর্তী পুনর্গঠনে আন্তর্জাতিক সহায়তার ভূমিকা অপরিহার্য। ইউক্রেনের অবকাঠামো ধ্বংস, জনগণের জীবনযাত্রার ক্ষতি, অর্থনৈতিক সংকটের মোকাবিলা — এসবের জন্য একটি ব্যাপক অর্থনৈতিক প্যাকেজের প্রস্তাব আলোচনায় রয়েছে।
ট্রাম্প ও জেলেনস্কির বক্তব্য এবং প্রত্যাশা
ট্রাম্প নিজেই বলেছেন যে “যে কোনো সিদ্ধান্তটি চূড়ান্ত নয় যতক্ষণ না তিনি অনুমোদন দেন।” তবুও তিনি বৈঠককে একটি সম্ভাব্য ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখেন এবং আশা করেন এতে “শুরু হওয়া ডিলটি পূর্ণাঙ্গ শান্তির পথ তৈরি করতে পারে।”
জেলেনস্কি বলেন, তিনি সবকিছু যতটা সম্ভব চূড়ান্ত করার আগ্রহী, তবে তিনি নিশ্চিত করেননি যে বৈঠকেই কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে কি না। পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেছেন যে যদি ইউক্রেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার নিরাপত্তা গ্যারান্টির বিষয়টি এক ধরনের দুর্বল অবস্থানে থাকে, তবে তিনি তা জনমত যাচাইয়ের জন্য রেফারেন্ডামে নিতে প্রস্তুত — বিশেষ করে যদি রাশিয়া ৬০ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে।
চ্যালেঞ্জ ও বিপত্তি
যুদ্ধ এখনও অব্যাহত থাকায় এবং রাশিয়ার স্থির মনোভাব ও ভূখণ্ড দাবি থাকায় শান্তি আলোচনায় বড় চ্যালেঞ্জ গড়ে উঠেছে। রাশিয়া এখনও রাশিয়ায় অধিকৃত পূর্বাঞ্চল ও ডনবাসে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দাবি করছে, যা ইউক্রেন আপত্তি জানায়।
এছাড়াও, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভিন্ন মতভেদ রয়েছে কিছু শর্ত ও সময়সীমা নিয়ে। ইউক্রেন চায় নিরাপত্তা গ্যারান্টি দীর্ঘমেয়াদি ও বন্ধনমূলক হোক, যেখানে মার্কিন প্রস্তাবটি প্রথমে ১৫ বছরের মেয়াদী ছিল, যা পরে সমন্বয়ের প্রস্তাব এসেছে।
সম্ভাব্য ফলাফল ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই বৈঠকটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা যুদ্ধের দীর্ঘায়িতভাবে চলমান এই সংঘাতকে শান্তির পথে ফিরিয়ে আনতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্রসমূহ ইতোমধ্যেই সমর্থন প্রকাশ করেছে যে একটি শান্তি কাঠামো দ্রুত বাস্তবায়িত হওয়া উচিত, এবং যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে উদ্যোগটি তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
শান্তি চুক্তি বাস্তবায়িত হলে তা শুধু ইউক্রেনের জন্যই নয়, পুরো ইউরোপে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের ধ্বংস, মানবিক বিপর্যয় ও অর্থনৈতিক ক্ষতি থেকে উত্তরণের পথ তৈরি করতে পারে। তবে রাশিয়ার সহযোগিতা ও রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি কঠিন পরীক্ষা হবে।
চূড়ান্ত কথা
জেলেনস্কি ও ট্রাম্পের রোববারের বৈঠক একটি সংকটকালীন কূটনৈতিক উদ্যোগ; এটি যুদ্ধের সমাধানের জন্য একটি বড় সুযোগ হতে পারে। আলোচনা ২০-দফা পরিকল্পনা, নিরাপত্তা গ্যারান্টি, ভূখণ্ড ব্যালেন্স, ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে — যা যুদ্ধের অবসান ও স্থিতিশীল ভবিষ্যত গঠনের লক্ষ্যে কার্যকর প্রস্তাব হতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক समर्थन, রাশিয়ার অংশগ্রহণ, এবং রাজনৈতিক বাস্তবতায়।
জেলেনস্কি নিজে বলেছেন, “একদিনও নষ্ট করছি না,” যা এই বৈঠককে আরও গুরুত্ব দেয় — এটা কেবল একটি সমঝোতা বৈঠক নয়, বরং যুদ্ধের অগ্নিকুণ্ড থেকে শান্তির পথে একটি সম্ভাব্য স্বর্ণালি সুযোগ।
Related Posts
View All
“মার্কিন নৌযান ডুবিয়ে দাও”: ট্যাঙ্কার জব্দের পর রুশ সংসদ সদস্যের হুমকিতে বিশ্ব রাজনীতিতে উত্তেজনা
আন্তর্জাতিক জলসীমায় রাশিয়ান পতাকাবাহী তেল ট্যাঙ্কার জব্দের পর যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। রুশ সংসদ সদস্যের সামরিক হুমকি বিশ্ব রাজনীতিতে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। নীরব সাগর কি এবার সংঘাতের মঞ্চ হতে যাচ্ছে?

ভেনেজুয়েলার পর গ্রিনল্যান্ড: ট্রাম্পের আঙুল, NATO-র ভবিষ্যৎ ও নতুন ভূরাজনৈতিক সংকেত | Greenland after Venezuela: The Finger of Space, the Future of NATO, and New Geopolitical Signals
ভেনেজুয়েলার ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গ নতুন করে বিশ্ব রাজনীতিতে ঝড় তুলেছে। ডেনমার্ক সতর্ক করেছে—গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন হামলা মানেই NATO-র অবসান। এই সংকট আসলে কী ইঙ্গিত দিচ্ছে?

মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রে বন্দি, ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি: ভেনেজুয়েলার তেল আমরা নিয়ন্ত্রণ করবো | Maduro Brought to the US as Trump Vows to Take Control of Venezuela’s Oil
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে এনে বিচারের মুখোমুখি করার মধ্যেই ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন—ভেনেজুয়েলার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও দেশটির বিপুল তেল সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে নেওয়া হবে। এই ঘটনাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক ও উদ্বেগ।






