১৯৩৯ সালের “শীত যুদ্ধে” USSR–র প্রোপাগান্ডা এখন কেন “চেনা” মনে হয়?
১৯৩৯ সালের শীতযুদ্ধে সোভিয়েত প্রেস ও মিডিয়ার মিথ্যা বাণী আজকের রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের প্রোপাগান্ডার সঙ্গে চমকপ্রদ মিল রাখে। ইতিহাস, উপায় এবং সমসাময়িক প্রভাব পর্যালোচনা।

১৯৩৯ সালের “শীত যুদ্ধে” USSR–র প্রোপাগান্ডা এখন কেন “চেনা” মনে হয়? - Ajker Bishshow
১৯৩৯ সালের ৩০ নভেম্বর, Union of Soviet Socialist Republics (USSR) দাবি করেছিল, Mainila নামের একটি সীমান্ত গ্রামে Red Army–র তিন সৈন্য নিহত হয়েছে, এবং এর দায় চাপানো হয়েছিল ফিনল্যান্ডের ওপর। তবে পরবর্তী ইতিহাস অনুসন্ধানে প্রমাণ মেলে, এই “মেইনিলা ঘটনা” ছিল এক নির্মিত, অর্থাৎ false-flag অপারেশন। এর পরেই সোভিয়েতরা ডিপ্লোম্যাটিক চুক্তি ভেঙে, প্রায় ৫ লক্ষ সেনা নিয়ে ফিনল্যান্ডে আক্রমণ চালায় — এই ঘটনা থেকে শুরু হয় যে যুদ্ধে বলা হয় “Winter War (১৯৩৯–১৯৪০)”।
তৎকালীন সোভিয়েত শাসনকে, নাকে-চুলায় গ্যাস দিয়ে না হলেও, ইতিহাস, মিডিয়া ও প্রোপাগান্ডার ভাষায় যুদ্ধ ঠেকানোর ছাড় পায়নি। ১৯৩৯–৪০ সালের সময়ের সোভিয়েত প্রেস, সামরিক ও রাজনৈতিক কর্মকর্তারা একাত্ম সঙ্ঘবদ্ধভাবে কাজ করেছিল একটি প্রোপাগান্ডা প্রোগ্রামের অধীনে।
শীতযুদ্ধের প্রোপাগান্ডা: কৌশল ও বাণী
১৯৩৯–৪০ সালের সোভিয়েত প্রোপাগান্ডায় যা দেখা গিয়েছিল — সেই কৌশল এবং বাণীরা বিস্তর, এবং বেশ পরিকল্পিত ছিল। প্রধান কিছু দৃষ্টান্ত নিচে:
- False-flag উদ্যোগ: মেইনিলা ঘটনার মতো “স্ব-আক্রমণ” দেখিয়ে ফিনল্যান্ডকে আক্রমণের দায় চাপানো। পরবর্তীতে প্রমাণ মেলে, সেটা ছিল সাজানো।
- “চমকপ্রদ মুক্তিদাতা” হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন: সোভিয়েত মিডিয়া দাবি করেছিল, তারা ফিনল্যান্ডের সাধারণ মানুষের — শ্রমিক, কৃষক, দরিদ্র — মুক্তির জন্য এগিয়ে যাচ্ছে; ফিন সরকারকে দায়ী করা হচ্ছিল যুদ্ধের জন্য।
- দ্বিদ্বেষ, বৈষমা, শত্রুভাবিতাভাব: ফিনল্যান্ডের সরকার ও সামরিক নেতৃত্বকে “দুর্নীতিপূর্ণ, পুঁজিপতিসুলভ, রাজনৈতিক বিশ্বাসহীন” হিসেবে চিত্রায়ন করা হয়েছিল।
- ভীতির রাজনীতি ও যুদ্ধকে ন্যায্যতা দেওয়ার যুক্তি: ফিনল্যান্ডকে “পুঁজিবাদী রাষ্ট্রীয় শাসন” দ্বারা দমন করা হচ্ছিল — সোভিয়েতরা দাবি করেছিল, তারা ফিন জনগণকে পুঁজিবাদী দমন ও যুদ্ধ থেকে রক্ষা করছে।
তবে ঐ প্রোপাগান্ডা প্রচেষ্টা যতই পরিকল্পিত হোক, ফলাফল ছিল প্রত্যাশার বিপরীত: রেড আর্মি প্রচুর প্রাণহানি ও ব্যর্থতায় মুখোমুখি হয়।
আজকের রাশিয়া ও তথ্যযুদ্ধ: পুরনো প্লেবুকের পুনরাবৃত্তি
এই পর্যন্ত যা দেখলাম, তা ছিল ১৯৩৯-৪০ সালের প্রোপাগান্ডার ব্যবস্থাপনা ও দৃষ্টিকোণ। কিন্তু আজ, প্রায় ৮৫ বছর পরেও — সময় বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু প্রোপাগান্ডার মূল কৌশল ও বাণী অনেকাংশে একই রইল। প্রোপাগান্ডা সৃষ্টিকর্তারা কেবল মিডিয়া ও বার্তাপ্রচার মাধ্যম পরিবর্তন করেছেন।
- বর্তমান রুশ মিডিয়া ও রাজকীয় রূপে তথ্যযুদ্ধ মিশিয়েছে — যুদ্ধকে “আক্রমণ” না বলে “বিশেষ সামরিক অভিযান (special military operation)” হিসেবে উপস্থাপন।
- যুদ্ধ বা আগ্রাসনকে সৎ, ন্যায্য এবং আত্মরক্ষামূলক দেখানোর জন্য, “প্রতিপক্ষকে দোষারোপ” বা “ভীতি ও বিপদ” গড়ে তোলা — পুরনো সোভিয়েত কৌশলের প্রতিধ্বনি।
- তথ্য প্রচার, সামাজিক মিডিয়া, এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রচুর বার্তা ছড়ানো — যা আজকের প্রোপাগান্ডার এক প্রধান উপায়। এক আধুনিক গবেষণা দেখায়, ২০২২ সালের পূর্ণসংখ্যায় আক্রমণের আগে থেকেই রুশ মিলোগার ব্লগাররা টেলিগ্রামে প্রচুর পোস্ট ও ছবির মাধ্যমে তথ্যপ্রচারে অংশ নিয়েছিল।
- পাঠক বা শ্রোতার মন পরিবর্তনের জন্য ইতিহাস ও ইতিহাসচেতনা (historical memory) ব্যবহার: অতীতের যুদ্ধ, ভিক্টরি, ভুক্তভোগীদের মিথ, “নজিরা দিতে হবে” ইত্যাদি। বর্তমান রুশ প্রেস ও সরকার সময়-সময়েই পুরনো WWII (বিশ্বযুদ্ধ-২) স্মৃতি ও ন্যারেটিভকে কাজে লাগায়।
সংক্ষেপে — আজকের রুশ প্রোপাগান্ডা ও তথ্যযুদ্ধ অনেকাংশে ১৯৩৯–৪০ সালের USSR প্রোপাগান্ডার রিপ্লিকা বা রূপান্তর। শুধু মাধ্যম ও কনটেক্সট পরিবর্তিত।
কেন এই মিল? — কারণ এবং উদ্দেশ্য
কিছু কারণ বোঝা যায়:
- ইতিহাসিক রূপক (historical analogy) তৈরি: পুরনো “বীরত্ব”, “মুক্তিদান”, “জাতিগত নিরাপত্তা”–এর গল্প নতুন করে ব্যবহার করে জনগণকে এমন একটি ন্যারেটিভে আবদ্ধ করার চেষ্টা। পুরনো স্মৃতি মানে বিশ্বাসযোগ্যতা, এবং তা দিয়ে নতুন গ্যারান্টি।
- কার্যকর প্রোপাগান্ডা কৌশল (tested techniques): false-flag, ভীতিকর বাণী, শত্রু চিন্হায়ন — একবার কাজ করেছিল, তাই আবারও ব্যবহৃত হচ্ছে।
- নতুন মিডিয়া ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম: ১৯৩৯-তে পেপার, পোস্টার, রেডিও ছিল; আর এখন — সোশ্যাল মিডিয়া, টেলিগ্রাম, ভিডিও, রোবট অ্যাকাউন্ট — যা প্রোপাগান্ডাকে দ্রুত এবং ব্যাপকভাবে ছড়াতে সক্ষম।
- জনমতের নিয়ন্ত্রণ ও ঐক্য গঠন: যেকোনো যুদ্ধ বা আগ্রাসনের জন্য দরকার হয় জনমত ও ভিতর থেকে সমর্থন। ইতিহাসের পরিচিত বাণী ও রূপক দিয়ে মানুষের মন গঠনের চেষ্টা।
শীতযুদ্ধ বনাম আজকের যুদ্ধ: সমান্তরাল না, কিন্তু ধাঁচ একই
তবে এটা ভুল হবে যদি বলি ১৯৩৯ এবং ২০২৫ বা ২০২২ একদম একই রকম। সময়, প্রযুক্তি, ঘটনা — সব বদলেছে। কিন্তু “প্রোপাগান্ডার সরঞ্জাম ও বাণী”–র ধাঁচ (template) অনেকটা একই।
- ১৯৩৯–তে সেনাবাহিনী এবং সীমান্ত পরিবর্তন ছিল মূল উদ্দেশ্য, আর আজ ২০২২–এর মধ্যে ভূ–রাজনৈতিক বিস্তৃতি, নিয়ন্ত্রণ এবং তথ্য আধিপত্য ছড়ানোর চেষ্টা।
- প্রযুক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে — আজ সোশ্যাল মিডিয়া, ইন্টারনেট, মেম, ভয়-প্রচার, ডেটা বিশ্লেষণ, বট ব্যবহার; ১৯৩৯–তে ছিল প্রচলিত মিডিয়া, পত্রিকা, পোস্টার।
- ইতিহাস ও স্মৃতি ব্যবহারের মাত্রা ও প্রভাব বাড়েছে: আজ এক প্রজন্ম পুরোটা দিন-রাত ইন্টারনেটে; অতীত এবং বর্তমানের বীজ ইতিহাসকে নতুন করে গেঁথে দেওয়া যায়।
কেন আমাদের জন্য এটা গুরুত্বপূর্ণ?
আমরা দেখতে পাচ্ছি, ইতিহাস যেন পুনরাবৃত্তি পাচ্ছে — কিন্তু পুরনো দুর্ভাগ্য আরেক নামে, নতুন প্রযুক্তিতে। এই কারণেই:
- সচেতন থাকা জরুরি: যারা সংবাদ পড়েন, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে আছেন — তাদের জন্য প্রোপাগান্ডা ও মিথ্যাকে চিনতে পারা জরুরি।
- তথ্য যাচাই (fact-checking): ইতিহাস, প্রাসঙ্গিকতা, উৎস — সব সময় যাচাই করতে হবে। মিথ আর বাস্তবের মধ্যে পার্থক্য বোঝার চেষ্টা করুন।
- শিক্ষা ও ইতিহাস সচেতনতা: ইতিহাস শুধু অতীত নয়; বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্যও দৃষ্টান্ত হতে পারে। ইতিহাসের ভুল থেকে শিক্ষা নিন।
- মিডিয়া দক্ষতা (media literacy): সোশ্যাল মিডিয়া, নিউজ, পোস্ট, ছবি, ভিডিও — সব ক্ষেত্রে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
১৯৩৯ সালের শীতযুদ্ধে USSR যে প্রোপাগান্ডা চালিয়েছিল — false-flag, শত্রু-চিত্রায়ন, মুক্তিদাতা ও আত্মরক্ষার যুক্তি, ভীতি, ইতিহাসের ব্যাবহার — তার বেশিরভাগ কৌশল আজকের রুশ তথ্যযুদ্ধে পুনরাবৃত্তি পাচ্ছে। তথ্য ও মিডিয়া বদলেছে, কিন্তু প্রক্রিয়া অনেকটা একই।
এটিই হয় ইতিহাসের ভয়ঙ্কর শিক্ষা — যখন পুরনো মিথ নতুন প্রযুক্তিতে বেঁচে ওঠে। আমাদের দায়িত্ব হলো — সেই মিথকে চিনে ফেলা, প্রশ্ন করা, যাচাই করা।
Watch Video
Related Posts
View All
ইউরোপ কি যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া নিজেকে রক্ষা করতে পারবে? ন্যাটো প্রধানের কড়া বার্তা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা ছাড়া ইউরোপ নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে—এই ধারণাকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করলেন ন্যাটো মহাসচিব। তাঁর ‘গুড লাক’ মন্তব্য ইউরোপের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, ন্যাটোর ভবিষ্যৎ এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।

B-2 বোমারু থেকে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র: ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী হামলার সম্ভাব্য রূপরেখা |
B-2 স্টিলথ বোমারু বিমান ও টমাহক ক্রুজ মিসাইল—এই দুই অস্ত্রই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার হামলার পথে হাঁটে, তাহলে কীভাবে, কোন অস্ত্র দিয়ে এবং কোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে? এই প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সম্

নোবেল পুরস্কারের সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড দাবি জুড়লেন ট্রাম্প: নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো বার্তা ঘিরে তীব্র বিতর্ক | Trump Links Greenland Ambitions to Nobel Peace Prize in Message to Norway’s Prime Minister
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো এক বার্তায় গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তার আগ্রাসী অবস্থানকে নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার প্রসঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এই মন্তব্য ঘিরে ইউরোপ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।






