গাজা নিয়ে জাতিসংঘে উত্তেজনা: যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব ও রাশিয়ার পাল্টা খসড়া
জাতিসংঘে গাজা বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রস্তাব নিয়ে উত্তেজনা চরমে। মার্কিন সমর্থিত খসড়ার বিপরীতে রাশিয়া নিজস্ব প্রতিদ্বন্দ্বী প্রস্তাব জমা দিয়েছে। কোন প্রস্তাব গৃহীত হবে তা নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা তুঙ্গে।

গাজা নিয়ে জাতিসংঘে উত্তেজনা: যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব ও রাশিয়ার পাল্টা খসড়া - Ajker Bishshow
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে গাজা বিষয়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ মর্যাদাপূর্ণ প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্র তীব্র সমর্থন চাইছে — কিন্তু রাশিয়া তাদের নিজস্ব পরিপন্থী ড্রাফ্ট উপস্থাপন করে বিষয়টিকে আরও জটিল করছে। এই কূটনৈতিক সংঘাত কেবল গাজার ভবিষ্যৎই নির্ধারণ করবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যে আন্তর্জাতিক ব্যালান্সেই একটি নতুন মোড় দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব: “স্টেবলাইজেশন ফোর্স” ও ট্রানজিশন অথোরিটি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব মূলত ট্রাম্প–নেতৃত্বাধীন ২০-বিন্দু যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার ভিত্তিতে গঠিত। এর মূল উপাদানগুলো নিম্নরূপ:
- একটি Board of Peace গঠন করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা ট্রান্সিশনাল অথোরিটি হিসেবে কাজ করবে এবং গাজার সীমান্ত, প্রশাসন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার দায়িত্ব নেবে।
- গাজায় একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী (stabilization force) মোতায়েন করার প্রস্তাব রয়েছে, যা গাজার সীমান্ত পাহারা দেবে, সামরিক কমীকরণে কাজ করবে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
- প্রস্তাবে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি রয়েছে: গাজার পুনর্গঠন ও প্রশাসনিক সংস্কার চালানোর পর, প্যালেস্টাইন অটোরিটি যদি নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে, তাহলে “আস্থা গড়ার পথে একটি বিশ্বাসযোগ্য রাস্তা” গড়ে ওঠার কথা বলা হয়েছে যা আত্ম-নির্ধারণ ও রাষ্ট্র গঠনের দিকে যেতে পারে।
গত কয়েকদিনে যুক্তরাষ্ট্র তার খসড়ায় কিছু সংশোধন এনেছে — বিশেষ করে ফিলিস্তিনিদের আত্ম-নির্ধারণ (self-determination) এবং ভবিষ্যতে প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনার ভাষা শক্তিশালী করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র একাধিক দেশকে এই পরিকল্পনায় অংশ নিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছে — কাতার, মিশর, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, জর্ডান ও তুর্কি উল্লেখযোগ্য। তারা দ্রুত নিরাপত্তা পরিষদে এই প্রস্তাব গৃহীত করার আহ্বান জানাচ্ছে।
রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া: ভিন্ন ভিশন ও কৌশল
রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনায় গুঁড়ি ভাঙ্গার ভাষায় একটি পাল্টা প্রস্তাব দিয়েছে, যা বেশ স্পষ্ট রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ভিন্নতা প্রতিফলিত করে।
রাশিয়ার ড্রাফ্ট-প্রস্তাবের মূল দৃষ্টিভঙ্গা:
- Board of Peace বাতিল
- রাশিয়ার প্রস্তাবে Board of Peace বা ট্রানজিশনাল অথোরিটি উল্লেখটি বাদ দেওয়া হয়েছে, কারণ তারা মনে করে এটি গাজার স্বায়ত্তশাসন ও প্যালেস্টাইন কর্তৃত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
- দুই-রাষ্ট্র সমাধানকে গুরুত্ব
- রাশিয়া তার খসড়ায় বলেছে যে পশ্চিম তীর ও গাজাকে একত্রে একটি প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র হিসাবে গঠন করতে হবে, যেখানে প্যালেস্টাইন অটোরিটি শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে।
- নিয়মিত নিরাপত্তা পরিষদের কেন্দ্রীয় ভূমিকা
- রাশিয়া দাবী করছে যে নিরাপত্তা পরিষদকে এমন ভূমিকা দেওয়া উচিত, যাতে দীর্ঘমেয়াদে দায়বদ্ধতা, পর্যবেক্ষণ এবং প্রমাণিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা যায়।
- মানবিক প্রবেশাধিকার ও আইনগত বাধ্যবাধকতা
- রাশিয়ার প্রস্তাবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মানবিক আইন মান্য করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তারা দ্রুত এবং অটরুদ্ধভাবে সহায়তা পৌঁছানোর আহ্বানও করছে।
- পুরাতন সংহত সিদ্ধান্তের পুনরায় স্বীকৃতি
- রাশিয়া বলেছে যে তাদের প্রস্তাবটি যুক্তরাষ্ট্রের কনসেপ্টকে সংশোধন করার চেষ্টা, যাতে এটিকে পূর্ববর্তী নিরাপত্তা পরিষদ সিদ্ধান্তের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ করা যায়।
রাশিয়ার মিশন স্পষ্ট করে বলেছে যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে নয়। বরং তারা মনে করে তাদের প্রস্তাব গভীর এবং প্রামাণ্য শান্তির পথ তৈরি করতে পারে।
প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও কূটনৈতিক পাঠ
- যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনায় কিছু নিরাপত্তা পরিষদ সদস্য যেমন রাশিয়া ও চীন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের বলনায় রয়েছে যে Board of Peace অত্যধিক রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ দেবে এবং প্যালেস্টাইন অটোরিটির প্রভাবকে সীমাবদ্ধ করতে পারে।
- অপর দিকে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রস্তাবকে “শান্তি স্থাপনের জরুরি যন্ত্র” হিসেবে উপস্থাপন করছে। তারা সতর্ক করছে যে দেরি বা একতাবিহীনতা গাজার জন্য দিন দিন আরও বড় মানবিক সংকট তৈরি করতে পারে।
- ভোটের সম্ভাবনা: AP সূত্র বলেছে যে উভয় প্রস্তাব আগামী সপ্তাহে ভোটে আনা হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র আশাবাদী যে তারা প্রয়োজনীয় ৯টি ভোট পাবে এবং তারা ধারণা করছে যে রাশিয়া ও চীন হয়তো ভেটো করবেন না — বরং অবস্থান (abstain) করতে পারে।
- এই ভোট কেবল একটি প্রতীকী ঘটনা নয় — এতে গাজার পরবর্তী রাজনৈতিক কাঠামো, আন্তর্জাতিক বাহিনীর ভূমিকা, এবং প্যালেস্টাইন ভবিষ্যত রাষ্ট্র গঠনের দৃষ্টিভঙ্গা প্রতিফলিত হবে।
প্রভাব ও পরিণতি: গাজার জন্য কি অপেক্ষা করছে?
- নিরাপত্তা ও প্রশাসন
- যদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব গৃহীত হয়, তাহলে গাজার নিরাপত্তা এবং প্রশাসনে একটি সাময়িক, কিন্তু শক্তিশালী কাঠামো তৈরি হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাহিনী সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে গাজা পুনর্গঠনে সহায়ক হবে।
- প্যালেস্টাইন স্ব-নির্ধারণ ও রাষ্ট্র গঠন
- যদি উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে মধ্যপন্থা আসে, তাহলে গাজার জনগণ এবং প্যালেস্টাইনি নেতৃত্বের জন্য একটি “স্ব-নির্ধারণের পথ” খুলে যেতে পারে। তবে, এই পথ খুবই সঙ্কটজনক হবে: স্বায়ত্তশাসন এবং শাসন পুনর্গঠন ধাপে ধাপে হতে হবে, এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর থাকবে।
- আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক ভারসাম্য
- এই ভোট ও সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যে আন্তর্জাতিক শক্তির দৃষ্টিভঙ্গাকে প্রতিফলিত করবে। যুক্তরাষ্ট্র একটি এক গণ্ডি প্রস্তাব দিচ্ছে যা তাদের কূটনৈতিক ও στρατηγিক স্বার্থকে প্রতিফলিত করে। রাশিয়া তার প্রস্তাব দিয়ে আরও ঐতিহ্যবাহী পন্থা তুলে ধরছে — যেখানে নিরাপত্তা পরিষদ ও দুই-রাষ্ট্র সমাধানকে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছে।
- মানবিক প্রভাব
- গাজার সাধারণ মানুষের জন্য এই সিদ্ধান্তের গুরুত্ব বিশাল। একটি স্থিতিশীল প্রশাসন ও নিরাপত্তা কাঠামো তাদের জীবনের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আনতে পারে — রূপায়নের সুযোগ বাড়াতে পারে, পুনর্মিলনকে ত্বরান্বিত করতে পারে এবং সহায়তা কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে পারে। তবে, এটি কেবল তখনই সম্ভব যদি প্রস্তাব কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং রাজনীতি ও অর্থায়নের বাধাগুলো কাটিয়ে ওঠা যায়।
- ঝুঁকি ও বাধা
- - রাজনৈতিকভাবে, গৃহীত প্রস্তাবে ভেটো সম্ভাবনা রয়েছে।
- - বাস্তবায়নে অর্থ ও ম্যান্ডেটের অভাব হতে পারে।
- - গাজার জনগণ ও স্থানীয় নেতৃত্ব নতুন প্রশাসনিক কাঠামোর প্রতি অবিশ্বাস পোষণ করতে পারে।
- - আন্তর্জাতিক বাহিনী পরিচালনায় চ্যালেঞ্জ থাকতে পারে (সামরিক, জনদায়িত্ব, সীমান্ত পরিচালনা ইত্যাদি)।
উপসংহার
এই মুহূর্তে গাজার ভবিষ্যৎ একটি সংকীর্ণ ও নাজুক পথের ওপর দাড়িয়ে আছে — যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া তাদের কৌশল ও ভিশন লড়াইয়ে নেমেছে। যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত একটি স্থিতিশীলতা বাহিনীর অনুমোদন চাইছে, যেখানে গাজার সীমান্ত ও প্রশাসন উৎসে একটি “Board of Peace” গঠন করা হবে। অপর দিকে, রাশিয়া একটি ঐতিহ্যবাহী নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো এবং শক্তিশালী প্যালেস্টাইন কর্তৃত্বকে মনোনিবেশ করছে, দুই-রাষ্ট্র সমাধানের ওপর নিজের গুরুত্ব দিচ্ছে।
ভোট আগামী সপ্তাহে হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং তার ফলাফল গাজার জন্য এক নতুন অধ্যায় শুরু করতে পারে — বা বর্তমান উত্তেজনাকে আরও গভীর করতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর এখন গাজার উপর।
আমাদের ajkerbishshow.press-এ এই ঘটনা মনিটর করা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি বিশ্বের এক রাষ্ট্রীয় দ্বিধা এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি পুনঃস্থাপনের এক সম্ভাব্য মাইলফলক।
Related Posts
View All
ইউরোপ কি যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া নিজেকে রক্ষা করতে পারবে? ন্যাটো প্রধানের কড়া বার্তা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা ছাড়া ইউরোপ নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে—এই ধারণাকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করলেন ন্যাটো মহাসচিব। তাঁর ‘গুড লাক’ মন্তব্য ইউরোপের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, ন্যাটোর ভবিষ্যৎ এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।

B-2 বোমারু থেকে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র: ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী হামলার সম্ভাব্য রূপরেখা |
B-2 স্টিলথ বোমারু বিমান ও টমাহক ক্রুজ মিসাইল—এই দুই অস্ত্রই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার হামলার পথে হাঁটে, তাহলে কীভাবে, কোন অস্ত্র দিয়ে এবং কোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে? এই প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সম্

নোবেল পুরস্কারের সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড দাবি জুড়লেন ট্রাম্প: নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো বার্তা ঘিরে তীব্র বিতর্ক | Trump Links Greenland Ambitions to Nobel Peace Prize in Message to Norway’s Prime Minister
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো এক বার্তায় গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তার আগ্রাসী অবস্থানকে নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার প্রসঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এই মন্তব্য ঘিরে ইউরোপ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।






