মার্কিন চাপ থামাতে পারবে না ইরান-চীনের সহযোগিতা: চীনা রাষ্ট্রদূতের হুঁশিয়ারি
চীনের ইরানে রাষ্ট্রদূত কং পেইউ স্পষ্ট করে বলেছেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বা একতরফা চাপ কোনোভাবেই ইরান ও চীনের সম্পর্ক থামাতে পারবে না। দুই দেশের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব আরও গভীর হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

মার্কিন চাপ থামাতে পারবে না ইরান-চীনের সহযোগিতা: চীনা রাষ্ট্রদূতের হুঁশিয়ারি - Ajker Bishshow
৯ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে Mehr News Agency–র প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনের ইরানে রাষ্ট্রদূত Cong Peiwu বলেছেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপ থেকে ইরান ও চীনের সহযোগিতা থামবে না।
তিনি বলেন:
“We do not accept and will pay no attention to the unreasonable pressures from the United States, and we will show our opposition to them in practice and will not let them affect our interactions.”
এর আগে তিনি আরও বলেন:
“The unilateral sanctions that the United States has imposed on Iran will not be able to affect our relations, and we will continue our exchanges.”
একই সময়, ইরান ও চীনের উচ্চ পর্যায়ের আলোচনায়, কৌশলগত অংশীদারিত্ব ত্বরান্বিত করার পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে।
২. কি বললেন রাষ্ট্রদূত ও কি অর্থবহ
রাজনৈতিকভাবে এবং অর্থনৈতিকভাবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট তুলে ধরা যায়:
- রাষ্ট্রদূতের ভাষায় “ইরান আমাদের মিত্র দেশ, আমরা বন্ধুত্ব সাপেক্ষে কাজ করব এবং নিষেধাজ্ঞা আমাদের কাজকে ব্যাহত করতে দেব না” — এই মনোভাব স্পষ্ট।
- তাঁর বক্তব্যে যুক্ত রয়েছে — মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একপক্ষীয় নিষেধাজ্ঞাগুলো ইরান-চীন সহযোগিতাকে থামাতে পারবে না।
- ইরান ও চীনের মধ্যে রয়েছে মহত্বপূর্ণ আলোচনার ভিত্তি: দুই দেশের প্রেসিডেন্টদের মধ্যে সম্প্রতি আলোচনায় সম্ভাব্য সহযোগিতার স্তর বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
- এছাড়া, ইরানের উত্তরাঞ্চলীয় গিলান প্রদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলে রাষ্ট্রদূতের পরিদর্শন ও সম্ভাব্য বিনিয়োগ সুযোগ খুঁজে দেখার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই সবই ইঙ্গিত দেয় যে ইরান ও চীনের সম্পর্ক শুধুই কূটনৈতিক নয়— তা অর্থনৈতিক, শিল্প ও বিনিয়োগ ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হচ্ছে।
৩. অর্থনৈতিক ও শিল্পগত প্রসার
ইরান-চীন অংশীদারিত্ব শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক মাপের দিকে যাচ্ছে। এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো:
- ইরান ও চীনের মধ্যে ইতিমধ্যে আলোচনা চলছে একটি যৌথ সহযোগী কমিটি গঠনের বিষয়ে, যেখানে খনন, পেট্রোকেমিক্যালস, বিনিয়োগ সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করা হবে।
- ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ হয়েছে, ইরানে ১০৪,০০০-এরও বেশি কোঅপারেটিভ প্রতিষ্ঠান রয়েছে যা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও প্রতিকূলতা কমে যাচ্ছে — এবং চীনকে এই অংশ নিয়ে কাজ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
- উপযোগী তথ্য: ইরান থেকে চীনে পেট্রোলিয়াম বা নয়-তেল পণ্য রপ্তানি ও চীন থেকে রপ্তানি-আমদানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য—মেটাল, খনিজ, কৃষি সাপ্লাই ইত্যাদিতে সম্ভাবনা রয়েছে।
- উদাহরণ স্বরূপ: ইরানের কাঁচা তেল চীনে রেকর্ড পরিমাণে রপ্তানি করেছে—যা দেখাচ্ছে চীনের ইরানের প্রতি অর্থনৈতিক সাপোর্ট বাড়ছে।
এই অর্থনৈতিক প্রসার ইঙ্গিত দেয় যে শুধু রাজনৈতিক বন্ধুত্ব নয়, বাস্তব অভিযোজন ও বিনিয়োগ-মডেলও সামনে এসেছে।
৪. মার্কিন চাপ ও নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপট
এই সবের পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক চাপ, যা ইরান–চীন সম্পর্ককে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু বর্তমান বিবৃতি প্রমাণ দেয় যে এই চশমা পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না। নিচে সেটির কারণগুলো বিশ্লেষণ করা হলো:
- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে একপক্ষীয় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
- তবে, ইরান ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য–সহযোগিতার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও অংশীদারিত্বের স্তর বাড়ছে — যার ফলে নিষেধাজ্ঞাগুলোর কার্যকারিতা সীমিত হতে পারে।
- রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য স্পষ্ট — চীন এসব চাপকে ‘অস্বীকার’ করে এবং প্রয়োজনে বাস্তব প্রক্রিয়ায় তার বিরোধিতা করবে।
- এ ছাড়াও, আন্তর্জাতিক আইন বা ইউএন সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রেও ইরান-চীন অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে, যেমন যৌথ কমিটি নির্মাণ।
এই তথ্যগুলো দেখায়, নিষেধাজ্ঞা থাকলেও অংশীদারিত্বের গতিপথ বদলাতে পারে — অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য ও নতুন বাজার সন্ধানে।
৫. সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতা
তবে, কোনো অংশীদারিত্বই সহজে গড়া যায় না; ইরান-চীন মিথস্ক্রিয়াতেও রয়েছে কিছু চ্যালেঞ্জ:
- নিষেধাজ্ঞার রূপান্তর: যেসব নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে, সেগুলো বাণিজ্য-মার্গ ও প্রযুক্তিগত অংশে প্রয়োগ হতে পারে, যা অংশীদারিত্বকে সময়ের সঙ্গে পরীক্ষা করবে।
- ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা: মিত্রতা থাকা সত্ত্বেও, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব রয়েছে — যা কখনো কখনো ইরান বা চীনের জন্য বাধা হয়ে উঠতে পারে।
- ভিতরের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সঙ্কট: ইরানের অর্থনীতি ও অবকাঠামো চীনের সঙ্গে অংশ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত কিনা, তা বড় প্রশ্ন। বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও পরিকাঠামো উন্নয়ন সহজ নয়।
- পরিবেশ ও নিরাপত্তা: বিশেষ করে তালিকাভুক্ত শিল্পখাতে (খনন, পেট্রো-কেমিক্যাল) সচেতনতা ও পরিবেশ-নিয়ন্ত্রণের চাহিদা রয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি ভাবনায় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এই চ্যালেঞ্জগুলো সত্ত্বেও, ইরান–চীন অংশীদারিত্বের গতিপথ গতিশীল বলে মনে হচ্ছে।
৬. বিশ্লেষণ ও প্রভাব
এই মোক্ষম সময়ে ইরান ও চীনের অংশীদারিত্ব এমন কিছু দিক দেখাচ্ছে যা একাধিক মাত্রায় প্রভাব ফেলতে পারে:
- অত্যাধুনিক অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি: শুধুই তেল ও গ্যাস নয়, খনিজ, কৃষি প্রযুক্তি, কোঅপারেটিভ সেক্টর, এবং বিনিয়োগ-মডেলে অংশীদারিত্ব বাড়ছে—যেমন যৌথ কমিটির অভিজ্ঞতা।
- মিডল ইস্ট ও এশিয়ায় শক্তির মাপকাঠি বদলাতে পারে: যুক্তরাষ্ট্র যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, সেসবকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ইরান-চীন মিত্রতা একটি ‘বিকল্প শক্তি ব্লক’ বা ‘বিকল্প অর্থনৈতিক মডেল’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
- নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতার প্রশ্ন: যদি অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি পায় এবং কার্যকর হয়, তাহলে এক-পক্ষীয় নিষেধাজ্ঞার ক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে, যা আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে একটি জাত-পন্থা (multi-polarity) ইঙ্গিত দেয়।
- বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার জন্য পাঠ: ইরান–চীন অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি পায়ায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে—বিশেষ করে এশিয়া-ইউরোপ রুট, ইরান-চীন বাণিজ্য পথ ইত্যাদিতে।
- ভবিষ্যতে প্রযুক্তি ও অবকাঠামো বিনিয়োগ: যদি চীন ইরানে বিনিয়োগ বাড়ায়, তাহলে রেল, অবকাঠামো, বন্দর বা খনিজ খাতে অংশীদারিত্বের দরজা খুলে যেতে পারে—যা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ভেতরিকতা তৈরি করতে পারে।
৭. উপসংহার
প্রেসার বা নিষেধাজ্ঞার আবর্তেই দেখা যাচ্ছে — Iran ও China দুটি দেশ শুধুই সম্পর্ক গড়ছে না, বরং তা এক ধরনের মজবুত অংশীদারিত্বে রূপ নিচ্ছে। চীনের রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য এই বাস্তবতাকে স্বীকার করে: “মার্কিন চাপ থামাতে পারবে না এই অংশীদারিত্ব”।
এই প্রসার শুধু রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ নয়—এতে রয়েছে অর্থনৈতিক গঠন, ভূরাজনৈতিক রূপান্তর ও দক্ষিণ এশিয়া-মধ্যপ্রাচ্যে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা। নিষেধাজ্ঞার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল অংশীদারিত্ব বিচ্ছিন্ন করা, কিন্তু এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যাচ্ছে, ইরান ও চীনের মধ্যে নতুন মডেল তৈরি হচ্ছে যা নিষেধাজ্ঞাকে বাইপাস করার ক্ষমতা রাখে বলে মনে হয়।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এটা একটি দ্রুতবিস্তৃত সংকেত—ভূরাজনৈতিক এবং বাণিজ্যিক দুই ক্ষেত্রেই অংশীদারিত্বের নতুন পথ রচিত হচ্ছে। এই ধরণের পরিবর্তনকে মনিটর করা, সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ দুই-ই বিশ্লেষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
তাই বলা যায় — যদিও চাপ আছে, নিষেধাজ্ঞা আছে, তবে ইরান-চীন অংশীদারিত্ব থেমে যাবে না; বরং আগামী সময় সেটি আরও প্রবল এবং বহুমাত্রিক রূপ নিতে পারে।
Related Posts
View All
ইউরোপ কি যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া নিজেকে রক্ষা করতে পারবে? ন্যাটো প্রধানের কড়া বার্তা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা ছাড়া ইউরোপ নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে—এই ধারণাকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করলেন ন্যাটো মহাসচিব। তাঁর ‘গুড লাক’ মন্তব্য ইউরোপের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, ন্যাটোর ভবিষ্যৎ এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।

B-2 বোমারু থেকে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র: ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী হামলার সম্ভাব্য রূপরেখা |
B-2 স্টিলথ বোমারু বিমান ও টমাহক ক্রুজ মিসাইল—এই দুই অস্ত্রই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার হামলার পথে হাঁটে, তাহলে কীভাবে, কোন অস্ত্র দিয়ে এবং কোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে? এই প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সম্

নোবেল পুরস্কারের সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড দাবি জুড়লেন ট্রাম্প: নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো বার্তা ঘিরে তীব্র বিতর্ক | Trump Links Greenland Ambitions to Nobel Peace Prize in Message to Norway’s Prime Minister
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো এক বার্তায় গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তার আগ্রাসী অবস্থানকে নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার প্রসঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এই মন্তব্য ঘিরে ইউরোপ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।






