তাইওয়ানের জন্য ৭০০ মিলিয়ন ডলারের বিমান প্রতিরক্ষা মিসাইল সিস্টেম বিক্রি নিশ্চিত করলো যুক্তরাষ্ট্র | US Confirms $700 Million Air Defence Missile System Sale to Taiwan
তাইওয়ানের জন্য প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলারের NASAMS বিমান প্রতিরক্ষা মিসাইল সিস্টেম বিক্রির সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বাড়তে থাকা চীন–তাইওয়ান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই চুক্তি অঞ্চলজুড়ে নতুন কৌশলগত গুরুত্ব তৈরি করেছে।

তাইওয়ানের জন্য ৭০০ মিলিয়ন ডলারের বিমান প্রতিরক্ষা মিসাইল সিস্টেম বিক্রি নিশ্চিত করলো যুক্তরাষ্ট্র | US Confirms $700 Million Air Defence Missile System Sale to Taiwan - Ajker Bishshow
যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি তাইওয়ানের সঙ্গে একটি বড় অস্ত্র উদ্যোগে সম্মত হয়েছে — বিমান প্রতিরক্ষা সিস্টেম হিসেবে NASAMS (National Advanced Surface-to-Air Missile System)। মার্কিন সরকারের প্রতিরক্ষা নিরাপত্তা সহযোগিতা এজেন্সি (Defense Security Cooperation Agency, DSCA) একটি নোটিফিকেশন জারি করেছে, যা কংগ্রেসকে জানায় যে তারা তাইওয়ানকে তিনটি NASAMS ইউনিট এবং সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম বিক্রি করতে চান, আনুমানিক খরচ $১.১৬ বিলিয়ন।
তবে, বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে দেখানো হয়েছে যে চুক্তির চূড়ান্ত মূল্য প্রায় $৭৬১ মিলিয়ন (NT$24.98 বিলিয়ন), যা প্রায় $৭০০ মিলিয়ন হিসেবে উল্লিখিত হয়েছে।
NASAMS কী — এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
- NASAMS একটি মাঝামাঝি-পরিসরের (medium-range) মহড়া বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা বিমান, ক্রুজ মিসাইল এবং UAS (ড্রোন) ধরণের হুমকির বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে।
- এটি AMRAAM Extended Range (ER) মিসাইল ব্যবহার করতে সক্ষম, যা বেশি দুরত্বে এবং উচ্চতা থেকে টার্গেট ধরা দিতে পারে।
- NASAMS-এর পরিসর, ক্ষমতা এবং বহুমুখী ট্র্যাকিং সিস্টেম (একাধিক টার্গেট নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার সক্ষমতা) তাইওয়ানের বায়ু প্রতিরক্ষা কাঠামোতে একটি বড় বর্ধন আনবে।
- এছাড়া, NASAMS ইন্টারঅপারেবল ডিজাইন রয়েছে — অর্থাৎ, তা অন্যান্য সিস্টেম (যেমন রাডার, কমান্ড-নিয়ন্ত্রণ নেটওয়ার্ক) সঙ্গে কাজ করতে পারে, যা তাইওয়ানকে প্রতিরক্ষা অংশীদারদের সঙ্গে আরও ভাল সমন্বয় গড়তে সহায়তা করবে।
চুক্তি ও বাস্তবায়ন
- সরকারী নথিতে বলা হয়েছে, তাইওয়ান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি ইতিমধ্যেই চুক্তি চূড়াকরণ করেছে।
- চুক্তি “American Institute in Taiwan (AIT)” এবং “ROC Defense Mission to the USA”–এর মধ্যে স্বাক্ষর করা হয়েছে।
- ডকুমেন্ট অনুযায়ী, চুক্তি ১৪ জানুয়ারি, ২০২৫ থেকে কার্যকর এবং ৩১ ডিসেম্বর, ২০৩০ পর্যন্ত প্রযোজ্য থাকবে।
- অনুসারে অভ্যন্তরীণ নকশা, ডিফেন্স মন্ত্রণালয় বলেছে যে NASAMS ইউনিটগুলো তাইপেই (Songshan জেলা) এবং নিউ তাইপেই (Tamsui) এলাকায় মোতায়েন করা হবে — যা তাইওয়ানের প্রয়োজনীয় ভৌগলিক ও কৌশলগত অবস্থানকে প্রতিফলিত করে।
মার্কিন উদ্দেশ্য ও যুক্ত যুক্তিসমূহ
যুক্তরাষ্ট্র এই বিক্রয়কে কেবল সামরিক দৃষ্টিকোন থেকেই দেখছে না — এটি কৌশলগত এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিকোন থেকেও গুরুত্বপূর্ণ:
- আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক সঙ্কেত: যুক্তরাষ্ট্র এই বিক্রয়কে একটি শক্তিশালী বার্তা হিসেবে পাঠাচ্ছে, যে তারা তাইওয়ানকে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করতে প্রস্তুত।
- নিজেদের নিরাপত্তা এবং ইকোনমিক স্বার্থ: DSCA বলেছে, এই ধরনের বিক্রয় “যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয়, অর্থনৈতিক, এবং নিরাপত্তা স্বার্থে” উপকৃত হবে।
- উন্নয়ন ও আধুনিকীকরণ: তাইওয়ান নিজেই তার প্রতিরক্ষা আধুনিকীকরণ প্রচেষ্টায় আছে, এবং NASAMS যুক্ত করা তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা স্তরকে দৃঢ়তা দেবে, বিশেষ করে ক্রুজ মিসাইল বা ড্রোন হুমকির বিরুদ্ধে।
- প্রমাণিত সক্ষমতা: NASAMS ইতিমধ্যেই ইউক্রেনে ব্যবহৃত হয়েছে, যা এটি “ক্যাম্প-টেস্টেড” প্রমাণ করে এবং তাইওয়ানকে আত্মবিশ্বাস দিতে পারে যে এটি বাস্তব হুমকির সামনে কার্যকর হবে।
চীনের প্রতিক্রিয়া ও উত্তেজনা
- চীন খুব চাপে এই বিক্রয়কে নেয় এবং তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। গার্ডিয়ান জানায় চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী “সঙ্কল্পমূলক প্রতিক্রিয়া” নেবে বলেছে।
- বেইজিং বলেছে, এই চুক্তি চীনের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি; এছাড়া, তারা যুক্তরাষ্ট্রকে এমন পদক্ষেপ থামাতে আহ্বান জানিয়েছে যা “প্রদেশগত স্থিতিশীলতা ও শান্তি” ব্যাহত করতে পারে।
- চীনের প্রতিক্রিয়া শুধু কূটনৈতিক নয় — এমন আশঙ্কা রয়েছে যে তারা সামরিক মহড়ার রূপ নিতে পারে বা তাইওয়ানপ্রত্যক্ষ হুমকি বাড়াতে পারে, যেহেতু এটি তাদের “এক দেশ, দুই ব্যবস্থা” শাস্ত্রবাদের সীমান্তকে চ্যালেঞ্জ করে।
তাইওয়ানের প্রতিক্রিয়া
- তাইওয়ান নিজেই এই চুক্তি স্বাগত জানিয়েছে — কারণ এটি তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা গঠনকে শক্তিশালী করবে এবং বিশ্লেষকরা দেখছেন এটি একটি কার্যকর “রিডলাইনে” শক্তি বৃদ্ধির হিসাব।
- তাদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রাণালয় মনে করছে যে এই রূপান্তর দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ এবং প্রতিরক্ষা স্থায়িত্ব গড়ার প্রচেষ্টার সঙ্গে মানানসই।
- এছাড়া, NASAMS-এর মোতায়েনযোগ্যতা (মোবাইল লঞ্চার, যোগাযোগ, ইন্টিগ্রেশন) তাইওয়ানকে দ্রুত হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম করবে, বিশেষত জরুরি সময়ে।
বিশ্লেষণ: কৌশলগত গুরুত্ব
- স্তরায় প্রতিরক্ষা গঠন (Layered Defence): তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা রাজনীতিতে আগে থেকেই বিভিন্ন ধরণের সিস্টেম রয়েছে — যেমন Patriots (দীর্ঘ-পরিসরের), নিজস্ব তৈরি সিস্টেম ইত্যাদি। NASAMS যুক্ত হওয়ায় এটি মধ্য-পরিসরের একটি শক্তিশালী স্তর তৈরি করবে, যা তাদের প্রতিরক্ষা গঠনকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করবে।
- নিয়ন্ত্রণশীল উত্তেজনা: যুক্তরাষ্ট্র এই ধরণের বিক্রয়কে কেবল অস্ত্র বিক্রি হিসেবে না দেখে, একটি কৌশলগত ছাত্রবাহক হিসেবে ব্যবহার করছে — তারা তাইওয়ানের সক্ষমতা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে চীনে একটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তা পাঠাচ্ছে যে তারা নিরাপদতা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
- সঙ্কট প্রতিবন্ধকতা (Deterrence): বেইজিংয়ের সম্ভাব্য আগ্রাসনের মুখে NASAMS তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা আর্কিটেকচারে একটি শক্তিশালী “প্রতিরোধকারী” স্তর যোগ করতে পারে। যদি তাইওয়ান তার আকাশ-হুমকির বিরুদ্ধে দুর্বল থেকে যায়, তাহলে আগ্রাসন সহজ হতে পারে। NASAMS যুক্ত হয়ে, প্রতিরোধ গড়ে উঠতে পারে এবং বেইজিংকে দ্বি–পক্ষীয় সংঘর্ষে যেতে আরও বড় ঝুঁকি নিতে বাধ্য করা যায়।
- রিপিয়ার ও লজিস্টিক ইস্যু: এই ধরণের সিস্টেম শুধু কেনার বিষয় নয় — এটি রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ এবং অংশ সরবরাহেও অবলম্বন করে। যুক্তরাষ্ট্র এবং তাইওয়ানকে দীর্ঘমেয়াদী সমঝোতা গড়তে হবে যাতে NASAMS সঠিকভাবে মোতায়েন, পরিচালনা ও আপগ্রেড করা যায়।
সম্ভাব্য ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ
- চীনের উত্তেজনা বৃদ্ধি: চীন এই বিক্রয়কে নিজের সার্বভৌমত্বের হুমকি হিসেবে দেখে, এবং এই ধরনের অস্ত্র বিক্রি উত্তেজনাকে আরও তীব্র করতে পারে, যার ফলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
- লজিস্টিক ও প্রশিক্ষণ চ্যালেঞ্জ: তিনটি ইউনিট কেনার পাশাপাশি তাইওয়ানকে প্রযুক্তিগত ও অপারেশনাল সক্ষমতা গড়তে হবে — প্রশিক্ষণ, পথভাগ স্থাপনা, অংশ সরবরাহ ইত্যাদিতে ব্যয় এবং সময় লাগতে পারে।
- নীতি ও কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া: যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক ভূমিকা এইভাবে সক্রিয় থাকা চীনের সঙ্গে দ্বন্দ্বের ঝুঁকি বাড়ায়। বেইজিং বিনা প্রতিক্রিয়া দিবে না, এবং এ ধরনের অস্ত্র বিক্রি তাদের “লাল রেখা” হতে পারে।
- অর্থনৈতিক বোঝাপড়া: $৭০০ মিলিয়ন বা তার আশপাশের মূল্য থাকা সত্ত্বেও, বাস্তব ব্যয় (সহকারী সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ) আরও বেশি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত — তাইওয়ানকে প্রায় $৭০০ মিলিয়ন মূল্যের NASAMS বিক্রি — কেবল একটি অস্ত্র লেনদেন নয়, এটি চীন-তাইওয়ান-যুক্তরাষ্ট্র ত্রিরাষ্ট্ৰিয় উত্তেজনার এক নতুন অধ্যায়। এটি তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে এবং তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা গঠনে একটি মাইলফলক হতে পারে। পক্ষান্তরে, চীনের প্রতিক্রিয়া এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জটিলতা একটি বাস্তব চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গিয়েছে।
এই চুক্তির ফলাফল শুধুমাত্র মিলিটারি দৃষ্টিকোন থেকে নয়, কূটনৈতিক ও স্থিতিশীলতার দৃষ্টিকোন থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ — এবং ভবিষ্যতে এর প্রভাব পুরো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে অনুভূত হতে পারে।
Related Posts
View All
ইউরোপ কি যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া নিজেকে রক্ষা করতে পারবে? ন্যাটো প্রধানের কড়া বার্তা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা ছাড়া ইউরোপ নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে—এই ধারণাকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করলেন ন্যাটো মহাসচিব। তাঁর ‘গুড লাক’ মন্তব্য ইউরোপের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, ন্যাটোর ভবিষ্যৎ এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।

B-2 বোমারু থেকে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র: ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী হামলার সম্ভাব্য রূপরেখা |
B-2 স্টিলথ বোমারু বিমান ও টমাহক ক্রুজ মিসাইল—এই দুই অস্ত্রই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার হামলার পথে হাঁটে, তাহলে কীভাবে, কোন অস্ত্র দিয়ে এবং কোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে? এই প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সম্

নোবেল পুরস্কারের সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড দাবি জুড়লেন ট্রাম্প: নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো বার্তা ঘিরে তীব্র বিতর্ক | Trump Links Greenland Ambitions to Nobel Peace Prize in Message to Norway’s Prime Minister
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো এক বার্তায় গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তার আগ্রাসী অবস্থানকে নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার প্রসঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এই মন্তব্য ঘিরে ইউরোপ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।






