ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনা: জাতিসংঘের সমর্থন ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ | Trump’s Gaza Plan: UN Endorsement and Future Challenges
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ট্রাম্পের ২০‑দফা গাজা পরিকল্পনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করেছে। পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী, বোর্ড অব পিস এবং ফিলিস্তিনি প্রশাসনের শর্তসাপেক্ষ পথ। যদিও এটি গাজার জন্য নতুন সম্ভাবনার সূচনা হতে পারে, তবুও রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ ও সমালোচনা।

ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনা: জাতিসংঘের সমর্থন ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ | Trump’s Gaza Plan: UN Endorsement and Future Challenges - Ajker Bishshow
গত ১৭ নভেম্বর ২০২৫, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ (UN Security Council) একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে — তারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা শান্তি পরিকল্পনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত গাজায় কয়েক বছরের যুদ্ধ ও মানবিক সংকটের পর একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে — যদিও এর সঙ্গে রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ ও সমালোচনা।
ট্রাম্পের ২০‑দফা পরিকল্পনা কী বলেছে?
ট্রাম্পের পরিকল্পনায় মোট ২০ ধাপ রয়েছে, যার উদ্দেশ্য গাজাকে স্থিতিশীল করা, পুনর্গঠন করা এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার জন্য কাঠামো তৈরি করা।
কিছু প্রধান দিক:
- তৎক্ষণাৎ যুদ্ধবিরতি – গাজার বর্তমান যুদ্ধ-বিরতি ধারাবাহিকতার নিমিত্তে প্রথম ধাপ হিসেবে ধরা হয়েছে।
- আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী (ISF) – একটি International Stabilization Force গঠন করা হবে।
- ISF গাজার সীমান্ত নিরাপত্তা, অসশস্তিকরণ এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্র কমাতে কাজ করবে।
- ISF “প্রয়োজনীয় সমস্ত ব্যবস্থা” নেয়ার অনুমোদন পাবে, যা যুদ্ধ সক্ষমতার দৃষ্টিকোণ থেকে একটু উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
- বোর্ড অব পিস (Board of Peace) – একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনিক কাঠামো গঠন করা হবে, যাকে “বোর্ড অব পিস” বলা হয়েছে।
- বোর্ড গাজার পুনর্গঠন, মানবিক সহায়তা বিতরণ ও প্রশাসন তদারকি করবে।
- ট্রাম্প নিজেই বোর্ডের নেতৃত্ব দিতে পারেন — এমন ইঙ্গিত আগে থেকেই ছিল।
- গেজা শাসন ব্যবস্থাপনা – একটি “বেসীয়, প্রযুক্তোক্র্যাটিক” (technocratic) ফিলিস্তিনী কমিটি গঠন করা হবে, যা দিনে‑দিনে গাজা পরিচালনায় কাজ করবে।
- অর্থায়ন ও পুনর্গঠন – গাজার পুনর্স্থাপন ও উন্নয়ন কাজ করার জন্য বিশ্বব্যাঙ্ক বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানসমূহের সঙ্গে একটি ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করার প্রস্তাব রয়েছে।
- ফিলিস্তিন রাষ্ট্রতন্ত্রের পথ – পরিকল্পনায় একটি শর্তসাপেক্ষ “রূপান্তরযোগ্য পথ” তুলে ধরা হয়েছে ফিলিস্তিনের স্ব-নির্ধারণ ও রাষ্ট্রতন্ত্রের দিকে। কিন্তু এটি অবিলম্বে নয়, বরং নির্দিষ্ট শর্ত পূরণের পরে সম্ভব হবে।
নিরাপত্তা পরিষদে ভোট: সমর্থন ও বিরোধ
- নিরাপত্তা পরিষদে এই প্রস্তাব ১৩টি দেশ “হ্যাঁ” বলেছে, এবং রাশিয়া ও চীন সিদ্ধান্তে অব্যাহতি নিয়েছে (abstain)।
- এটি একটি বিরল সমঝোতা বলে বিশ্লেষকরা দেখছেন, কারণ গাজা সংকট আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল, এবং দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিভাজন রয়েছে।
- জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের দপ্তর থেকে বলা হয়েছে, এই ভো‘ট “যুদ্ধবিরতির সমন্বয়কে আরও মজবুত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ”।
সমালোচনা ও ঝুঁকি
যদিও নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে, কিন্তু অনেকেই এর ওপর সংশয় ছুড়ে দিচ্ছেন:
- হামাসের প্রতিক্রিয়া
- হামাস এই পরিকল্পনাকে স্বাগত জানায়নি। তারা বলেছে এটি গাজার উপর “আন্তর্জাতিক অভিভাবকত্ব” (international guardianship) আরোপ করছে।
- তাদের মতে, ISF-এর অস্তিত্ব এবং “নিরস্ত্রীকরণের” দায়িত্ব গাজার প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর ক্ষমতা কমানোর উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে, যা তাদের পক্ষ থেকে গ্রহণযোগ্য নয়।
- নির্ধারিত সময়সীমা ও অজ্ঞাত কাঠামো
- বোর্ড অব পিসের সদস্যদের নাম এখনও পুরোপুরি ঘোষণা করা হয়নি, এবং বোর্ডের কাজকর্ম কীভাবে হবে — তা অনেক দিকেই অস্পষ্ট।
- ISF-এর ম্যান্ডেট “প্রয়োজনীয় সমস্ত ব্যবস্থা নেওয়ার” অনুমোদন থাকলেও, কোন দেশগুলি সেনা দান করবে তা এখনো স্পষ্ট নয়।
- ফিলিস্তিনী রাষ্ট্রতন্ত্রের ভবিষ্যত
- যদিও পরিকল্পনায় ফিলিস্তিন রাষ্ট্র তৈরির কথাও বলা হয়েছে, তবে ভাষাটি শর্তসাপেক্ষ: প্রথমে গাজার পুনর্গঠন ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের “সংশোধন” ঘটতে হবে।
- কিছু বিশ্লেষক বলছেন, এই ভাষা খুব বলিষ্ঠ নয় এবং এটি “স্বপ্নময় প্রতিশ্রুতি”তেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
- নির্মাণ ও অর্থায়ন
- গাজার পুনর্স্থাপনে কোটি কোটি ডলারের দরকার হবে, এবং যদিও বিশ্বব্যাঙ্ক বা অন্য সংস্থাগুলোর সঙ্গে ট্রাস্ট ফান্ড গড়ার কথা আছে, কিন্তু এটি কার্যকরভাবে কাজ করবে কিনা তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
- মানবাধিকার ও সার্বভৌমত্ব
- কিছু দেশ ও সমালোচক মনে করেন, এই পরিকল্পনা গাজার সার্বভৌমত্বকে ছিন্ন করে দিতে পারে, বিশেষত যখন ISF এবং বোর্ড অব পিসের মতো আন্তর্জাতিক কাঠামো গঠন করা হচ্ছে।
গুরুত্ব ও সম্ভাবনা
যাই হোক, এই সিদ্ধান্ত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকে ইতিহাসগড়ার সম্ভাবনা রাখে:
- মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি নতুন সুযোগ পেতে পারে — দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা সংঘর্ষ ও অবস্থা স্থগিতকরণে এই পরিকল্পনা এক “প্রতিকল্প” হতে পারে, যদি এটি সুষ্ঠুভাবে প্রয়োগ করা হয়।
- আন্তর্জাতিক সহযোগিতা — নানা দেশ ISF-এ অংশ নিতে পারে, এবং গাজার পুনর্গঠনে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন বাড়তে পারে।
- গাজার মানুষের জন্য সম্ভাব্য পরিবর্তন — গাজার জনসংখ্যা (যাঁরা যুদ্ধ দ্বারা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন) যদি এই কাঠামোগত পরিকল্পনা কাজ করে, তাহলে তারা প্রয়োজনীয় মানবিক পরিষেবা, নিরাপত্তা ও পুনর্গঠন পেতে পারে।
- রাজনৈতিক কাঠামো গঠন — বোর্ড অব পিস এবং প্রযুক্তোক্র্যাটিক প্রশাসন গাজার জন্য একটি নতুন, অরাজনৈতিক শুরু দিতে পারে, যা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার পথ খুলে দিতে পারে।
কিন্তু এই পথ সহজ হবে না
এটি স্পষ্ট যে এখনও অনেক বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে:
- হামাস যদি ISF-এর কার্যক্রমে বাধা দেয় বা নিজ অস্ত্র সমরক্ষণে অনড় থাকে, তাহলে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
- নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত বাস্তব জায়গায় প্রয়োগ করার জন্য অংশী দেশগুলোর রাজনৈতিক ইচ্ছা থাকা প্রয়োজন।
- পুনর্গঠন ও অর্থায়ন একটি দীর্ঘমেয়াদী কাজ — এবং ট্রাস্ট ফান্ড বা আন্তর্জাতিক অর্থায়নের গতি ধীর হতে পারে।
- ফিলিস্তিনি জনগণের মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং স্ব-নির্ধারণের দাবি রয়েছে — যেটি “শর্তসাপেক্ষ পথ” দ্বারা পুরোপুরি মেটানো নাও যেতে পারে।
ট্রাম্পের গাজা শান্তি পরিকল্পনার নিরাপত্তা পরিষদের সমর্থন একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক সঙ্কেত পাঠায়: গাজার ভবিষ্যত শুধু যুদ্ধ এবং ধ্বংস নয়, শান্তি ও পুনর্গঠনের দিকেও এগোতে পারে। তবে এটি কোনও সহজ সমাধান নয় — বড় রাজনৈতিক, নিরাপত্তাগত এবং মানবিক বাধা রয়েছে। পরিকল্পনা সফল হবে কিনা, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন, অংশী দেশগুলোর দায়বদ্ধতা, এবং গাজাবাসীর বাস্তব স্বার্থ ও দাবি কতটা মানা হয় তার ওপর।
Related Posts
View All
ইউরোপ কি যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া নিজেকে রক্ষা করতে পারবে? ন্যাটো প্রধানের কড়া বার্তা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা ছাড়া ইউরোপ নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে—এই ধারণাকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করলেন ন্যাটো মহাসচিব। তাঁর ‘গুড লাক’ মন্তব্য ইউরোপের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, ন্যাটোর ভবিষ্যৎ এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।

B-2 বোমারু থেকে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র: ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী হামলার সম্ভাব্য রূপরেখা |
B-2 স্টিলথ বোমারু বিমান ও টমাহক ক্রুজ মিসাইল—এই দুই অস্ত্রই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার হামলার পথে হাঁটে, তাহলে কীভাবে, কোন অস্ত্র দিয়ে এবং কোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে? এই প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সম্

নোবেল পুরস্কারের সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড দাবি জুড়লেন ট্রাম্প: নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো বার্তা ঘিরে তীব্র বিতর্ক | Trump Links Greenland Ambitions to Nobel Peace Prize in Message to Norway’s Prime Minister
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো এক বার্তায় গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তার আগ্রাসী অবস্থানকে নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার প্রসঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এই মন্তব্য ঘিরে ইউরোপ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।






