গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের নতুন দাবি: শুরু কি বড় ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত? | The U.S. Has to Have Greenland”: Trump Sparks Global Geopolitical Tensions
ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গ্রিনল্যান্ড থাকা “অপরিহার্য”। এই মন্তব্য ঘিরে ডেনমার্ক, গ্রিনল্যান্ড এবং ইউরোপজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র কূটনৈতিক উত্তেজনা, যা ভবিষ্যতে বিশ্ব রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের নতুন দাবি: শুরু কি বড় ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত? | The U.S. Has to Have Greenland”: Trump Sparks Global Geopolitical Tensions - Ajker Bishshow
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার এক বিবৃতিতে আবারও জোর দিয়ে বলেছেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড থাকা “অত্যন্ত জরুরি”, কিন্তু এটি মূলত জাতীয় নিরাপত্তার কারণে প্রয়োজন এবং পর পরই তিনি এই ভূখণ্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করার লক্ষ্য পুনরায় সামনে এনেছেন।
ট্রাম্পের মন্তব্যের পর গত কয়েক ঘণ্টায় ডেনমার্ক এবং গ্রিনল্যান্ড থেকে কূটনৈতিক চাপ, বিরক্তি এবং কঠোর প্রতিক্রিয়া এসেছে, যেগুলো অল্প সময়ের মধ্যেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের লক্ষ্যবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
ট্রাম্পের বক্তব্য: “আমাদের কাছে গ্রিনল্যান্ড থাকতে হবে”
ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড থাকা দরকার, কিন্তু তিনি দাবি করেন যে এটি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ বা অন্য অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়; বরং জাতীয় নিরাপত্তা এবং ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের জন্য এটি অপরিহার্য।
গত বছর থেকে ট্রাম্প বহুবার একই বক্তব্য দিয়েছেন এবং বলেছেন যে গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। পূর্বের সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, “আমরা ওই ভূখণ্ডে থাকা ছাড়া আমাদের নিরাপত্তা রক্ষা ঠিকভাবে করতে পারব না।”
এই মন্তব্য সমন্বিত প্রেস কনফারেন্স এবং মন্ত্রণালয়ের স্তরে প্রদত্ত বিভিন্ন ইঙ্গিতের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা যায়, যেখানে ট্রাম্প বারবার বলেছেন আন্তর্জাতিক কৌশলগত ভূমিকা এবং সুরক্ষা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ বাড়ছে।
বিশেষ দূত নিয়োগ — ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের প্রতিক্রিয়া
ট্রাম্প দক্ষিণপূর্ব যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা রাজ্যের গভর্নর জেফ ল্যান্ড্রিকে গ্রিনল্যান্ড বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত (Special Envoy) হিসেবে নিযুক্ত করেছেন। এই পদটি ট্রাম্পের দীর্ঘকালীন মিত্রদের মধ্যে অন্যতমকে দিয়ে দেওয়া হয়, এবং ঐ অঞ্চলে মার্কিন আগ্রহকে আরও জোরদার করার উদ্দেশ্য হিসেবে বিশ্লেষিত হচ্ছে।
তবে এই নিয়োগকে কেবল সামরিক বা কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে না —
ডেনমার্ক এবং গ্রিনল্যান্ড উভয়ই এই পদক্ষেপকে কূটনৈতিক তীব্র প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে গ্রহণ করেছে।
ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই নিয়োগ ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ডের প্রতি অব্যাহত আগ্রহের প্রতিফলন, এবং এটি “সম্পূর্ণরূপে অগ্রহণযোগ্য” বলে মন্তব্য করেছেন।
এছাড়া ডেনমার্কের নেতৃত্বাধীন কূটনৈতিক মহল জানিয়েছে যে তারা এই ধরণের পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অসম্মান হিসেবে দেখছে এবং তারা স্বীকৃতি দিয়েছে যে গ্রিনল্যান্ড একটি স্বশাসিত অঞ্চল, যার ভবিষ্যৎ তারা নিজেই নির্ধারণ করবে।
গ্রিনল্যান্ডের স্বার্থ ও জনগণের মানসিকতা
গ্রিনল্যান্ড, যা একটি স্বশাসিত ডেনিশ ভূখণ্ড, প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এবং ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বর্তমান খনিজ অনুসন্ধান এখনও পুরোপুরি খোলা হয়নি এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে যাওয়ার ব্যাপারে উচ্চমাত্রার বিরোধিতা দেখা গেছে।
একটি সাম্প্রতিক জরিপে ৮৫ শতাংশের বেশি গ্রিনল্যান্ডবাসী বলেছেন তারা যুক্তরাষ্ট্রে যোগ দিতে চায় না, বরং তারা স্বাধীনতা ও নিজস্ব রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ চাই।
গ্রিনল্যান্ডের আদি জনগোষ্ঠীর অভিভাবক হিসেবে বলা হয় —
“আমাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার অধিকার রয়েছে। আমাদের কেউ কিনবে বা আরোপ করবে তেমন কোনো ইচ্ছা নেই।” — এমন প্রতিক্রিয়া দেশটির তরুণ, সাধারণ জনগণের মধ্যে লক্ষ্য করা গেছে।
ডেনমার্ক এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
ডেনমার্কের সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে গ্রিনল্যান্ড বিক্রয়ের ক্ষেত্রে কোনো আগ্রহ নেই, এবং তারা আন্তর্জাতিক আইন ও স্বাধিকারকে পুরোপুরি রক্ষা করবে। উপরন্তু, ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সরকার বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিনিময়ে ধরেই নেওয়া যাবে না বলে উদ্দ্যেশ্য ব্যাখ্যা করেছেন।
ডেনমার্ক আবারও তাদের দূতকে সমন করেছে এবং স্পষ্টভাবে বলেছেন যে তারা বরাবরই নিজ ভূখণ্ডের স্বার্থ রক্ষায় বদ্ধপরিকর। একই সাথে, নর্ডিক দেশগুলোর নেতৃবৃন্দও এই বিষয়ে নিজেদের সমর্থন জানিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্বের গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছে।
ট্রাম্পের আগ্রহের পেছনে জটিল কৌশলগত কারণ
যদিও ট্রাম্প বারবার বলেছেন গ্রিনল্যান্ডের প্রয়োজন মূলত জাতীয় নিরাপত্তার কারণে, এমন কিছু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন এটা একাধিক গ্লোবাল কৌশলগত উদ্দেশ্যের প্রতিফলন:
- আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা:
- গ্রিনল্যান্ড উত্তর পশ্চিম ইউরোপ ও কানাডার ইস্যুগুলোর কেন্দ্রীয় ভূখণ্ড হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ট্রাম্প দাবি করেছেন এটি আন্তর্জাতিক সুরক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
- খনিজ ও ভূতাত্ত্বিক সম্পদ:
- গ্রীনল্যান্ডে প্রচুর খনিজ সম্পদ, মূল্যবান ধাতু এবং অন্যান্য উপাদান রয়েছে, যা ভবিষ্যতে গ্রীন টেক ও সামরিক প্রযুক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। যদিও আবিষ্কারের কাজ সীমিত, তবেও এর সম্ভাবনাকে আর কোনো দেশ উপেক্ষা করতে পারে না।
- আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা:
- রাশিয়া এবং চীনসহ অন্যান্য শক্তি আগ্রহী হয়ে যাচ্ছে উত্তর আর্কটিকে কেন্দ্র করে কৌশলগত দিক থেকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকতে চায় না এবং ট্রাম্পের বক্তব্য সেই অভিপ্রায়কে প্রতিফলিত করে।
ট্রাম্পের অফিশিয়াল মন্তব্য এবং বিশেষ Envoy নিয়োগ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উত্তেজনা ও বিতর্কের একটি নতুন অধ্যায় খুলে দিয়েছে।
ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডকে সাথে নিয়ে কোন পন্থা নেয়া হবে, তা এখনও অনিশ্চিত।
গ্রিনল্যান্ডবাসীর পক্ষ থেকেও স্বার্থ ও স্বাধীনতার প্রতি দাবি দিন দিন আরও জোরালো হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই ধরণের দাবি যদি কূটনৈতিকভাবে ভুলভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে তা সিরিয়াস কূটনৈতিক সংঘাত তৈরি করতে পারে — বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, নর্ডিক দেশগুলো এবং ন্যাটো অংশীদারদের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে।
ট্রাম্প প্রশাসন কি আরও বৃহত্তর নিরাপত্তা বা ভৌগোলিক কৌশলগত দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ঐচ্ছিক দিকগুলো বাস্তবায়ন করবে, সেটাই দেখার বিষয়।
তবে বর্তমানে পরিষ্কার যে — গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ ধারাবাহিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এবং এই বিতর্ক বিশ্ব রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
Related Posts
View All
“মার্কিন নৌযান ডুবিয়ে দাও”: ট্যাঙ্কার জব্দের পর রুশ সংসদ সদস্যের হুমকিতে বিশ্ব রাজনীতিতে উত্তেজনা
আন্তর্জাতিক জলসীমায় রাশিয়ান পতাকাবাহী তেল ট্যাঙ্কার জব্দের পর যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। রুশ সংসদ সদস্যের সামরিক হুমকি বিশ্ব রাজনীতিতে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। নীরব সাগর কি এবার সংঘাতের মঞ্চ হতে যাচ্ছে?

ভেনেজুয়েলার পর গ্রিনল্যান্ড: ট্রাম্পের আঙুল, NATO-র ভবিষ্যৎ ও নতুন ভূরাজনৈতিক সংকেত | Greenland after Venezuela: The Finger of Space, the Future of NATO, and New Geopolitical Signals
ভেনেজুয়েলার ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গ নতুন করে বিশ্ব রাজনীতিতে ঝড় তুলেছে। ডেনমার্ক সতর্ক করেছে—গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন হামলা মানেই NATO-র অবসান। এই সংকট আসলে কী ইঙ্গিত দিচ্ছে?

মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রে বন্দি, ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি: ভেনেজুয়েলার তেল আমরা নিয়ন্ত্রণ করবো | Maduro Brought to the US as Trump Vows to Take Control of Venezuela’s Oil
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে এনে বিচারের মুখোমুখি করার মধ্যেই ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন—ভেনেজুয়েলার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও দেশটির বিপুল তেল সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে নেওয়া হবে। এই ঘটনাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক ও উদ্বেগ।






