রাশিয়া পশ্চিমাদের দোষ দিচ্ছে ইরানের পারমাণবিক ফাইল সংকটের জন্য
রাশিয়া সম্প্রতি পশ্চিমা দেশগুলোকে দায়ী করেছে ইরানের পারমাণবিক প্রোগ্রাম নিয়ে চলমান রাজনৈতিক সংকটের জন্য। মস্কো বলেছে, কূটনৈতিক পথ বন্ধ হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে এবং পশ্চিমাদের উচিত শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য আলোচনায় ফিরে আসা।

রাশিয়া পশ্চিমাদের দোষ দিচ্ছে ইরানের পারমাণবিক ফাইল সংকটের জন্য - Ajker Bishshow
রাশিয়া সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতি কড়া সমালোচনা করে বলেছে যে, ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রোগ্রাম নিয়ে বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের জন্য পশ্চিমারা পুরোপুরি দায়ী। মস্কোর অভিযোগ, পশ্চিমারা কূটনৈতিক পথকে অবরুদ্ধ করেছে এবং তাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার “প্রায় মৃত” হয়ে গেছে।
বর্তমান অবস্থা: কূটনৈতিক মারাত্মক গণ্ডগোল
রাশিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধি মিখাইল উলিয়ানোভ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সন্মেলনে বলেছে যে ইরানের পারমাণবিক ফাইল এখন “পুরোপুরি গলদ্দার গলিতে পৌঁছে গেছে” এবং পশ্চিমা শীর্ষশক্তি – বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউকে, জার্মানি, ফ্রান্স (ইউরোপীয় “ট্রায়ো” বা E3) – এই deadlock–এর দায়ী। তাদের মতে, পশ্চিমারা কূটনীতি বা আলোচনাকে অগ্রাধিকার না দিয়ে, এখন নতুন নিষেষাধিকার সংক্রান্ত পদক্ষেপ এবং রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের পথ বেছে নিয়েছে।
উলিয়ানোভ আরও সতর্ক করেছেন যে পশ্চিমা দেশগুলোর পাশপাশি নেওয়া নতুন বিরূপ রেজল্যুশন ফলশ্রুতিতে ভয়াবহ ধারণযোগ্য পরিণতি আনতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন যে, ইরান ইতিমধ্যেই IAEA (আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা)-এর মহাপরিচালককে একটি সতর্কবার্তা দিয়েছে যে "কায়রো চুক্তি" কার্যত শেষ দিক এগোচ্ছে।
উলিয়ানোভ বলেছেন, “তদন্ত ও বাঁচার দাওয়াই করা হচ্ছে, কিন্তু ধন্যবাদ পশ্চিমাদের প্রচেষ্টার কারণে কূটনীতি প্রায় মৃত।
রাশিয়া বলেছে: দ্বিচারিতা চলছে
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাকারোভা পশ্চিমাদের পদক্ষেপকে “প্ররোচনামূলক” হিসেবে সমালোচনা করেছেন। তার মতে, পশ্চিমা দেশগুলো যা করছে, তা আসলে IAEA–এর গ্যারান্টি এবং বিড়ম্বনায় ভরা “গ্যার্ডস সিস্টেম”-এর ওপর আস্থা নষ্ট করছে, এবং “নন-প্রলিফারেশন আর্কিটেকচার”-এর সুস্থতা বিঘ্নিত করছে।
জাকারোভা যুক্তি দিয়েছেন, যারা এত বছর JCPOA (২০১৫ পারমাণবিক চুক্তি)-এর অঙ্গীকার লঙ্ঘন করেছে, অথচ এখন “নন-প্রলিফারেশন” নামবর দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণ করছে — এটা এক ধরনের মগজগোড়া এবং ন্যায্য নয়।
কূটনৈতিক সমাধান পুনরায় গুরুত্ব পাচ্ছে
রাশিয়া একাধিকবার জোর দিয়ে বলেছে যে পারমাণবিক ক্ষেত্রে একমাত্র পথ কূটনৈতিক হয়। মস্কো এক ধরনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানে বিশ্বাসী, এবং দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও আন্তর্জাতিক কাঠামোর মধ্যে সমন্বয় নিয়েই তারা পরিস্থিতি সমাধানের চেষ্টা করছে।
জাকারোভা আরও বলছেন যে, “যখনই আলোচনা বা সমঝোতার পথ বন্ধ হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে মিলিটারী হুমকি বা প্রতিক্রিয়া পুরো গ্লোবাল নিরাপত্তা গঠনকে ঝুঁকিতে ফেলে দেয়।” তিনি পশ্চিমাদের অনুরোধ করেছেন যে তারা স্যাংকশন, সামরিক হুমকি বা অবরোধের পথ থেকে সরে এসে আবার কূটনীতি ও সংলাপের দিকে ফিরে আসুক।
ইরানও প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে
রাশিয়ার সমালোচনা এমন এক সময়ে এসেছে যখন ইরানও স্পষ্ট করে জানাচ্ছে যে সে এবার “গম্ভীর গ্যারান্টি” চাইছে – বিশেষ করে তার পারমাণবিক স্থাপনায় নিষ্ক্রিয় বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কা থেকে মুক্তি পেতে।
জাকারোভা বলছেন, মস্কো বিশ্বাস করে যে, যদি ইরানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় — বিশেষ করে পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর কোনো যুদ্ধ বা আক্রমণ হুমকি না থাকে — তাহলে ইরান ও পশ্চিমাদের মধ্যে পুনরায় কূটনৈতিক আলোচনা চালু হওয়া সম্ভব।
পূর্ববর্তী সম্পর্কের প্রেক্ষাপট
এই সংকট নতুন নয়। রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের পারমাণবিক প্রোগ্রামকে সমর্থন করে আসছে এবং বলেছে এটি শুধুমাত্র “শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্য” নিয়ে করা হচ্ছে।
সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ, রসাটম (রাশিয়ার পারমাণবিক এজেন্সি)-এর সিইও আলেকসে লিখাচেভ এক IAEA সম্মেলনে বলেছিলেন যে, ইরানের পারমাণবিক দৃষ্টান্ত শুধুমাত্র কূটনৈতিক মাধ্যমে সমাধান করা যেতে পারে, এবং মস্কো এই প্রক্রিয়াকে সবরূপে সমর্থন করতে ইচ্ছুক।
তাছাড়া, রাশিয়া ইরানের সঙ্গে কোমপ্রিহেন্সিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপয়ে রয়েছে, যা পারমাণবিক সহযোগিতার জন্য একটি শক্ত ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
ইরান ও IAEA-এর সম্পর্ক ও উত্তেজনা
ইরান সম্প্রতি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল IAEA-র সঙ্গে তার সহযোগিতা স্থগিত করার – মস্কো এই সিদ্ধান্তকে বলেছে যে এবং এটা ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের একটি হামলার পর যে প্রতিক্রিয়া, তারই ফল। রাশিয়া একে একটি “সাজানো পরিস্থিতি” বলেছে, যেখানে পশ্চিমারা IAEA ব্যবস্থার প্রতি আস্থা নষ্ট করছে এবং সহযোগিতার পরিবর্তে চাপ বাড়াচ্ছে।
অপ্রত্যাশিত অভিযোগ ও প্রতিবিধান
একদিকে রাশিয়া বলেছে পুরাতন নিষেধাজ্ঞাগুলো পুনরায় আরোপ করার বা নতুন রেজল্যুশন গঠনের মাধ্যমে পশ্চিমারা বিষয়কে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগাচ্ছে।
অন্যদিকে, কিছু আন্তর্জাতিক রিপোর্ট বলেছে যে যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিমার একটি অংশ রয়েছে যেটি ইরানকে পারমাণবিক সক্ষমতার উন্নয়ন থেকে বিরত রাখতে চায়, এমনকি কিছু রিপোর্টে বলা হয়েছে যে রাশিয়া একবার “জিরো-এনরিচমেন্ট” (ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা) স্কিম প্রস্তাব করেছে। তবে মস্কো এই ধরনের অভিযোগকে পুরোপুরি অস্বীকার করেছে এবং বলে যে এটি একটি রাজনৈতিক কুপ্রচারের অংশ।
পরিণতি ও ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গা
- রাশিয়া স্পষ্টভাবে দিয়েছে ইঙ্গিত যে তারা একটি কূটনৈতিক প্রক্রিয়া চালু রাখতে চায় এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর আক্রমণ বা অবরোধের ভয়ভীতির অবসান চায়।
- মস্কো পশ্চিমাদের প্রতি তার আস্থাহীনতা প্রকাশ করেছে এবং বলেছে যে তারা যদি দক্ষিণার অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞার পথে ফিরে যায়, তাহলে ইরান অবশ্যই প্রতিক্রিয়া দেখাবে।
- রাশিয়া একই সঙ্গে জানিয়েছে যে সে IAEA‑র সঙ্গে সম্পৃক্তি বজায় রাখতে চায় এবং চাইবে আন্তর্জাতিক পরমাণু গঠন, বিশেষত নন-প্রলিফারেশন আর্কিটেকচার, মজবুত ও বিশ্বাসযোগ্য হতে।
- তবে এই সমীকরণে বড় প্রশ্ন হলো: ইরান কি সত্যিই পশ্চিমা পক্ষের বিশ্বাসযোগ্য গ্যারান্টি পাবে? এবং IAEA ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কি কূটনীতির পথ বেছে নিয়ে পরিস্থিতি স্থিৰ করতে পারবে?
রাশিয়ার এই অভিযোগ যে পশ্চিমারা ইরানের পারমাণবিক প্রোগ্রামকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে, ইরান ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি জটিল চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করেছে। মস্কো স্পষ্টভাবে বলেছে যে কূটনীতিই একমাত্র পথ — যে পথে হঠাৎ একটি নিষিদ্ধার রেজল্যুশন বা সামরিক হুমকি না দিয়ে আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান করা যেতে পারে।
যদি পশ্চিমারা যুক্ত হয় কূটনৈতিক ব্যবস্থায় — যেমন নিষিদ্ধার রিজল্যুশন করা বন্ধ করা, আক্রমণের হুমকি সরানো এবং গ্যারান্টি দেওয়া — তাহলে ইরান আশঙ্কামুক্ত হতে পারে এবং পারমাণবিক সহযোগিতার নতুন ধাপ শুরু করতে পারে। তবে যদি মনোভাব অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে বর্তমান “impasse” আরও অবনতিতে যাবে এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও পারমাণবিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
রাশিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে, তারা চান একটি শক্তিশালী, বিশ্বাসযোগ্য, ও নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক কাঠামো যেখানে ইরান তার শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রোগ্রাম চালিয়ে যেতে পারে, এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিরাপত্তামূলক আশঙ্কাগুলোর সমাধান করা যায়। কিন্তু এই প্রত্যাশা পূরণ করার জন্য প্রয়োজন হবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সমঝোতার পথ — এবং এটি হবে এক নতুন কূটনৈতিক পরীক্ষা।
সংক্ষেপে বললে, রাশিয়া মুলত পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর দায় চাপাচ্ছে ইরানের পারমাণবিক বিষয়ে কূটনৈতিক deadlock-এর জন্য, এবং বলেছে যে তারা কূটনৈতিক সমাধানই চায়, কিন্তু তার জন্য গ্যারান্টি ও বিশ্বাসযোগ্যতা দরকার। পশ্চিমারা যদি নতুন করে কূটনীতি এবং সমঝোতার দিকে না ফিরে আসে, তাহলে বর্তমান অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে এবং পারমাণবিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
Related Posts
View All
ইউরোপ কি যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া নিজেকে রক্ষা করতে পারবে? ন্যাটো প্রধানের কড়া বার্তা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা ছাড়া ইউরোপ নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে—এই ধারণাকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করলেন ন্যাটো মহাসচিব। তাঁর ‘গুড লাক’ মন্তব্য ইউরোপের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, ন্যাটোর ভবিষ্যৎ এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।

B-2 বোমারু থেকে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র: ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী হামলার সম্ভাব্য রূপরেখা |
B-2 স্টিলথ বোমারু বিমান ও টমাহক ক্রুজ মিসাইল—এই দুই অস্ত্রই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার হামলার পথে হাঁটে, তাহলে কীভাবে, কোন অস্ত্র দিয়ে এবং কোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে? এই প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সম্

নোবেল পুরস্কারের সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড দাবি জুড়লেন ট্রাম্প: নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো বার্তা ঘিরে তীব্র বিতর্ক | Trump Links Greenland Ambitions to Nobel Peace Prize in Message to Norway’s Prime Minister
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো এক বার্তায় গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তার আগ্রাসী অবস্থানকে নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার প্রসঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এই মন্তব্য ঘিরে ইউরোপ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।






