ইরান-রাশিয়ার সামরিক বন্ধুত্ব: পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছে | Iran-Russia Military Cooperation: Progressing as Planned
ইরান এবং রাশিয়া তাদের সামরিক ও কৌশলগত সহযোগিতা পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে চলছে। রাষ্ট্রদূত কজেম জলালির সাক্ষাৎকার অনুযায়ী, অংশীদারিত্বের অনেক দিক এখনও গোপন রয়েছে। এই প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে কৌশল, আঞ্চলিক প্রভাব, এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা।

ইরান-রাশিয়ার সামরিক বন্ধুত্ব: পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছে | Iran-Russia Military Cooperation: Progressing as Planned - Ajker Bishshow
নভেম্বর ২৩, ২০২৫ — ইরানের রাশিয়ায় রাষ্ট্রদূত কজেম জলালি সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে, ইরান এবং রাশিয়া তাদের সামরিক-রক্ষা সংক্রান্ত সম্পর্কটি পূর্ণ পরিকল্পনা অনুযায়ী গড়ে তুলছে। Mehr News Agency‑এর (MNA) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, এই সহযোগিতার অনেক দিক এখনও গোপন রাখা হয়েছে, এবং “শত্রুরা” (ইরান ও রাশিয়া যে এই সম্পর্ক শক্তিশালী করছে, তা) খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।
এই বিবৃতি কেবল কূটনৈতিক কথাবার্তা নয়, বরং ইরানের বহুমাত্রিক কূটনীতি ও রাশিয়ার সঙ্গে এক দীর্ঘস্থায়ী কৌশলগত পথচিহ্নের অংশ হিসেবে দেখা উচিত। নিচে আমরা এই কুটনৈতিক সংযোগের দৃষ্টিভঙ্গা, ইতিহাস, গতিপথ এবং প্রভাব বিশ্লেষণ করব।
১. কনটেক্সট: ইরান-রাশিয়া কৌশলগত অংশীদারিত্বের পটভূমি
১.১ নতুন কৌশলগত চুক্তি
ইরান এবং রাশিয়া জানুয়ারি ২০২৫-এ একটি “বহুমুখী কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি” (Comprehensive Strategic Partnership) স্বাক্ষর করেছে, যা আগামী ২০ বছরের জন্য উদ্দেশ্য নির্ধারণ করছে।
- এই চুক্তিতে অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও এনার্জি‑সহ একাধিক দৃষ্টিকোণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
- এটি দুই দেশকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার বিপরীতে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ দিচ্ছে।
১.২ বহুমাত্রিক সহযোগিতা
শুধু সামরিক ক্ষেত্রে নয়, ইরান-রাশিয়া সহযোগিতা অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে অনেক বেশি বিস্তৃত। মস্কো ও তেহরান নিয়মিত পরামর্শ বিনিময় করছে বিভিন্ন স্ট্র্যাটেজিক আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে।
এতে ইরান ও রাশিয়া এক কৌশলগত অক্ষ গঠন করছে, যেখানে তারা একে অপরকে পুটিন-ওয়াশিংটন অথবা তেহরান-ওয়াশিংটন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যালান্স করার জন্য ব্যবহার করছে।
২. সামরিক অংশীদারিত্ব: মূল দৃষ্টিভঙ্গা ও ঘনিষ্ঠতা
২.১ ইরান রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য
জলালি তার সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, গত কিছু সময় ধরে রুশ–ইরান পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সম্পর্ক পরিকল্পনা অনুযায়ী চলছে।
- বিশেষভাবে, কিছু সহযোগিতার দিক “গোপনীয়ভাবে” চলছে, যা ইঙ্গিত করে যে তারা সাধারণ কূটনৈতিক চ্যানেলের বাইরে আরও গভীর রক্ষা-তথ্য এবং প্রযুক্তি বিনিময় করছে।
- তিনি উল্লেখ করেছেন যে, ইরান S-400 বছরের ওপর ভিত্তি করে রাশিয়াকে আগে আসলেই অনুরোধ করেনি, কিন্তু অন্যান্য কিছু মিলিটারি সহযোগিতা “পরিকল্পনা অনুযায়ী” এগুচ্ছে।
২.২ রাশিয়ার পরিপ্রেক্ষিত
জলালির ভাষায়, রাশিয়া ইতিমধ্যেই বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছে — যেমন স্ব-রক্ষার জন্য যৌথ চুক্তি — কিন্তু এগুলি “শুরু‑প্রাথমিক পর্যায়ে” রয়েছে।
- তিনি উল্লেখ করেছেন যে, ইরান–রাশিয়া চুক্তি রাশিয়া ও বেলারুস বা উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার চুক্তির মতো নয়।
- এটি ইঙ্গিত দেয় যে, ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে তাদের নিজস্ব স্বাতন্ত্র্যপূর্ণ এবং সমানভিত্তিক পারস্পরিক সম্পর্ক বিকাশ করতে চাচ্ছে, যেখানে তারা শুধু অস্ত্র বিক্রয় বা সরবরাহকারী-গ্রাহক হিসেবেই নেই, বরং অংশীদার হিসেবে কাজ করছে।
৩. ভূ-রাজনীতিক কারণ ও মোটিভেশন
৩.১ পশ্চিমা চাপ এবং নিষিদ্ধতা
- জলালি বলেন যে, ইসলামিক বিপ্লব পরবর্তী পশ্চিমার “অপব্যবহার” এবং বিশেষত সাম্প্রতিক অগ্রাধিকার রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষিদ্ধতা দুই দেশকে আরও কাছাকাছি এনে দিয়েছে।
- উভয় দেশই “একতরফাভিত্তিকতা” (unilateralism) বিরোধিতা করছে এবং “বহুপাক্ষিকতা” (multilateralism) সমর্থন করছে।
- অর্থাৎ, রাশিয়া ও ইরান একে অপরকে স্ট্র্যাটেজিক নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে দেখছে, বিশেষত পশ্চিমা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপে।
৩.২ আঞ্চলিক ও গ্লোবাল কৌশল
- জলালি আরও বলেছেন যে, ইরান এবং রাশিয়া সিরিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে তাদের কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তুলছে, যেখানে “সিরিয়ান জাতি বন্ধুবান্ধব” হিসেবে বিবেচিত।
- এছাড়া, জলালি জনগণ ও বেসরকারি ক্ষেত্রের সম্পর্ক বৃদ্ধি করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন — যা কেবল সামরিক সম্পর্ক সীমাবদ্ধ না রেখে দৃষ্টিকোণ বাড়ানো চায়।
- এটি স্পষ্ট করে যে, তাদের অংশীদারিত্ব শুধু অস্ত্র ও নিরাপত্তায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্তরে প্রতিষ্ঠিত অংশীদারিত্ব গঠন করার পরিকল্পনা।
৪. সম্ভাব্য ফলাফল ও প্রভাব
৪.১ সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধि
- যদি ইরান ও রাশিয়া তাদের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও গঠনমূলকভাবে এগোতে পারে, তাহলে ইরান তার সামরিক সক্ষমতা শক্তিশালী করতে পারবে, বিশেষত অত্যাধুনিক রাশিয়ান প্রযুক্তি ও সিস্টেম পেয়ে।
- গোপন চুক্তিগুলোর মাধ্যমে তারা নতুন সিস্টেম, অস্ত্র এবং যৌথ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গড়ে তুলতে পারে।
৪.২ কৌশলগত চাহিদায় ভারসাম্য
- পশ্চিমা চাপের মধ্যে, ইরান রাশিয়াকে কৌশলগত একাধিক দৃষ্টিকোণ থেকে নিজের অংশীদার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, এবং রাশিয়াও ইরানকে একটি মূল্যবান মিত্র হিসেবে দেখতে পারে।
- এটি তাদেরকে জাতীয় নিরাপত্তায় এক নতুন স্তর দিতে পারে, যেখানে তারা একে অপরকে নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে বিবেচনা করে।
৪.৩ আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধি
- ইরান-রাশিয়া অংশীদারিত্বে আরো গভীরতা আসার ফলে মধ্যপ্রাচ্য এবং এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে গ্যালভানিক সীমানার রাজনৈতিক ও সামরিক ভারসাম্য পরিবর্তন হতে পারে।
- বিশেষ করে সিরিয়া, লেবানন বা অন্যান্য অস্থির অঞ্চলে, তাদের সহযোগিতা স্থানীয় ও আঞ্চলিক কূটনীতি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপুর্ন অনুঘটক হতে পারে।
৪.৪ নিরাপত্তা এবং গোপনীয়তা চ্যালেঞ্জ
- যদিও জলালি গোপনীয়তা বজায় রাখার কথা বলেছেন, কিন্তু অত্যধিক গোপনীয়তা ও অপ্রকাশিত চুক্তি ভবিষ্যতে ভুল বোঝাবুঝি, অস্থিরতা বা আস্থা চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে।
- পাশাপাশি, যদি রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক দিশাহীনতা দেখা দেয়, তাহলে দুই দেশের জনগণ বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ে সংশয় বাড়তে পারে।
৫. সমালোচনা ও উদ্বেগ
৫.১ শত্রু পক্ষের দৃষ্টিকোণ
- জলালি স্পষ্ট করেছেন যে “শত্রুরা” তাদের সহযোগিতা খতিয়ে দেখছে।
- পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এই সম্প্র্রসারণকে সতর্ক দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করতে পারে।
- তারা উদ্বিগ্ন হতে পারে যে, ইরান-রাশিয়া অংশীদারিত্ব সামরিকভাবে আরও শক্তিশালী হলে অঞ্চলজুড়ে তাদের প্রভাব বেড়ে যাবে এবং তারা নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে।
৫.২ আন্তরিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা
- যদিও জলালি প্রতিফলন করছেন যে অংশীদারিত্ব গভীর হচ্ছে, তবে এটি পরিষ্কার নয় যে প্রতিটি দিক উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ হবে কিনা। গোপন চুক্তি এবং গোপন প্রস্তাবনা ভবিষ্যতে বিশ্বাসযোগ্যতা চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
- দীর্ঘমেয়াদে, উভয় পক্ষকে বিশ্বাসযোগ্যতা এবং স্থায়িত্ব বজায় রাখার জন্য একটি ব্যালান্সড এবং পারস্পরিক স্বচ্ছ অংশীদারিত্ব গঠন করতে হবে।
ইরান এবং রাশিয়া তাদের সামরিক‑রক্ষা সহযোগিতাকে শুধুমাত্র একটি গাড়নি হিসেবে দেখছে না; এটি তাদের কৌশলগত ভিশন এবং গ্লোবাল কোল্যাবোরেশনের একটি মূল স্তম্ভ। রাষ্ট্রদূত কজেম জলালির কথোপকথন অনুযায়ী, তারা পূর্ণ পরিকল্পনা মাফিক এগিয়ে যাচ্ছে, গোপন দিকগুলো রয়েছে এবং তাদের অংশীদারিত্ব শুধুমাত্র অস্ত্র বা যুদ্ধ সরবরাহে সীমাবদ্ধ নয়।
এই সম্পর্কের গভীরতা এবং পরিসর (কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক) ইঙ্গিত দেয় যে, ইরান ও রাশিয়া দীর্ঘমেয়াদে একে অপরকে অংশীদার হিসেবে দেখছে — বিশেষত পশ্চিমা নিষিদ্ধতা ও চাপে। তবে, গোপনীয়তা এবং আস্থা নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে, যা ভবিষ্যতে তাদের অংশীদারিত্ব আলোকপাত করতে পারে বা চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
এই কৌশলগত বন্ধুত্ব শুধুমাত্র ইরান ও রাশিয়ার জন্য নয়, মাটির ওপর এমনি একটা বার্তা বহন করে: যখন নিষিদ্ধতা ও রাজনৈতিক চাপে একই দৃষ্টিকোণ পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া যায়, তখন অংশীদারিত্ব গঠন নতুন কৌশলগত পথ তৈরি করতে পারে।
Related Posts
View All
ইউরোপ কি যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া নিজেকে রক্ষা করতে পারবে? ন্যাটো প্রধানের কড়া বার্তা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা ছাড়া ইউরোপ নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে—এই ধারণাকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করলেন ন্যাটো মহাসচিব। তাঁর ‘গুড লাক’ মন্তব্য ইউরোপের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, ন্যাটোর ভবিষ্যৎ এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।

B-2 বোমারু থেকে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র: ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী হামলার সম্ভাব্য রূপরেখা |
B-2 স্টিলথ বোমারু বিমান ও টমাহক ক্রুজ মিসাইল—এই দুই অস্ত্রই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার হামলার পথে হাঁটে, তাহলে কীভাবে, কোন অস্ত্র দিয়ে এবং কোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে? এই প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সম্

নোবেল পুরস্কারের সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড দাবি জুড়লেন ট্রাম্প: নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো বার্তা ঘিরে তীব্র বিতর্ক | Trump Links Greenland Ambitions to Nobel Peace Prize in Message to Norway’s Prime Minister
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো এক বার্তায় গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তার আগ্রাসী অবস্থানকে নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার প্রসঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এই মন্তব্য ঘিরে ইউরোপ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।






