ইরান-রাশিয়া-আজারবাইজানের নতুন চুক্তি: নর্থ-সাউথ করিডর কবে হাবে রূপান্তর?
ইরান, রাশিয়া এবং আজারবাইজান ২০২৫ সালের নভেম্বরের শেষের দিকে বাকি নর্থ–সাউথ করিডরের পশ্চিম রুটকে কার্যকর আন্তর্জাতিক পরিবহন ও ট্রানজিট চ্যানেলে রূপান্তর করার লক্ষ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি (MoU) স্বাক্ষর করেছে। নতুন ব্যবস্থাপনায় ভূ–রাজনৈতিক স্বার্থ, কাস্টমস ও লজিস্টিক নিয়মাবলী, এবং একীভূত রেল ও মালবাহী

ইরান-রাশিয়া-আজারবাইজানের নতুন চুক্তি: নর্থ-সাউথ করিডর কবে হাবে রূপান্তর? - Ajker Bishshow
২০২৫ সালের নভেম্বরে বাকি সম্মেলনে ইরান, রাশিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যে স্বাক্ষরিত নতুন চুক্তি নর্থ-সাউথ করিডরের পশ্চিম রুটকে একটি শক্তিশালী, সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য ট্রানজিট রুট হিসেবে গড়ার উদ্যোগ। এতে মালবাহী রপ্তানিতে unified tariff, logistics ও কাস্টমস ব্যবস্থার সমন্বয় হবে।
পটভূমি: কেন INSTC-র গুরুত্ব
- International North–South Transport Corridor (INSTC) হচ্ছে এক বহুমাত্রিক (মালবাহী রেল + সি–মার্গ + রোড) পরিবহন নেটওয়ার্ক, যা রাশিয়া, মধ্য এশিয়া, ককেসাস অঞ্চলকে পারস্য উপসাগর ও দক্ষিণ এশিয়ার বন্দরগুলোর সাথে সংযুক্ত করে।
- গত বছরগুলোতে, এই করিডরকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ভৌগলিক কৌশলে একটি বিকল্প হিসেবে দেখা হয়েছে, বিশেষ করে যখন স্যুয়েজ খাল বা বোষফরাস/দারদানেলস হয়ে চলাচলে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত ঝুঁকির সম্ভাবনা দেখা দেয়।
- INSTC এর কার্যকর রূপায়ণ হলে, রফতানি-আমদানি ও ট্রানজিট-বাণিজ্যে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো পায় সময় ও খরচে বড় সাশ্রয়, এবং ভূ-রাজনৈতিকভাবে একটি শক্তিশালী অঞ্চীয় অর্থনৈতিক ও ট্রানজিট নোড হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ।
✍️ কোন চুক্তি স্বাক্ষর হলো — এর মূল বৈশিষ্ট্য
- ২০২৫ সালের ২৬–২৯ নভেম্বর, বাকি সভার (83rd) Commonwealth of Independent States (CIS) ট্রান্সপোর্ট কাউন্সিল সভার সময়, তিনদেশের রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ — ইরান, রাশিয়া ও আজারবাইজানের — মধ্যে একটি ট্রিলেটারাল MoU স্বাক্ষরিত হয়েছে।
- মেমোরান্ডামে বলা হয়েছে — পশ্চিম রুট (western route) বরাবর মালবাহী পরিবহনের জন্য স্থায়ী দাম (fixed pricing) নির্ধারণ, একক (unified) প্রতিযোগিতামূলক রেট (through-tariff), এবং লজিস্টিক সার্ভিস ও কাস্টমস ব্যবস্থার সমন্বয় করা হবে।
- এর অর্থ: রপ্তানিকারক বা আমদানিকারকদের জন্য এখন থেকে যাতে — রুট, রেল + সি + রোড মিশ্র পরিবহন বা “block-trains” — নির্ধারিত এবং স্বচ্ছ রেট পাওয়া যায়; দাম এবং সময়ের unpredictability কমবে।
- পাশাপাশি, নিয়মিত “block trains” চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে, এবং Astara (ইরান/আজারবাইজান) টার্মিনাল উন্নয়নসহ পরিবহন ও লজিস্টিক ব্যবস্থাপনায় উন্নয়ন হবে।
🎯 চুক্তির লক্ষ্যগুলো ও প্রত্যাশা
এই নতুন চুক্তির পিছনে রয়েছে বেশ কিছু স্পষ্ট উদ্দেশ্য ও প্রত্যাশা:
- ট্রানজিট ফ্লো বৃদ্ধি: একাধিক উৎস জানাচ্ছে, ধার্য রয়েছে যে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে মাত্র পশ্চিম রুটে বছরে প্রায় ৫ মিলিয়ন টন পণ্য চলাচল করা শুরু হতে পারে। এবং ভবিষ্যতে ধাপে ধাপে এটি ১৫ মিলিয়ন টন পর্যন্ত উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
- রফতানি–আমদানি এবং ট্রানজিট-ব্যবসায় সময় ও খরচ কমানো: unified tariff + fixed pricing + regular block-trains + সমন্বিত কাস্টমস ও লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা — সব মিলিয়ে রপ্তানিকারক ও আমদানিকারকদের জন্য রুট হবে দ্রুত, দক্ষ ও সাশ্রয়ী।
- ভৌগলিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধিসহ রূপান্তর: রাশিয়া, মধ্য এশিয়া, ককেসাস থেকে পারস্য উপসাগর ও পরবর্তীভাবে ভারতীয় উপমহাদেশ — এই করিডর দিয়ে মাল পরিবহন হলে, ঐতিহ্যগত স্যুয়েজ/বোস্পরাস রুটের বিকল্প হিসেবে INSTC শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হবে। এর ফলে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর অর্থনীতি, রফতানি-আমদানি সেক্টর, এবং ট্রানজিট-শিপিং শিল্প নতুন মাত্রা পাবে।
- রূপায়ণযোগ্যির জন্য কাঠামোগত ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি: মাত্র রেললাইন নয় — লজিস্টিক সার্ভিস, customs harmonization, documentation digitalization ইত্যাদি বিষয়ক প্রস্তাবনা এসেছে, যা একবার সুনির্দিষ্ট হলে শুরু থেকে “predictable & secure transit environment” গড়া যাবে।
📈 সম্ভাব্য সুফল ও প্রতিকূলতা
✅ সুবিধা / সুফল
- খরচ-ও-সময় সাশ্রয়: রুপায়িত হলে, রপ্তানি-আমদানি বা ট্রানজিটের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে, এবং কোস্ট কমে যাবে।
- ভৌগলিকভাবে নতুন রুট বিকল্প: স্যুয়েজ খাল বা বোস্পরাস/দারদানেলস হয়ে চলাচলে জটিলতা বা ঝুঁকি থাকলে, INSTC হবে নির্ভরযোগ্য বিকল্প।
- অঞ্চলীয় অর্থনীতি ও রফতানিতে সুযোগ: রেল, বন্দর, logistics hub, ট্রানজিট infrastructure ইত্যাদিতে বিনিয়োগ–কর্মসংস্থান ও নতুন অর্থনৈতিক কার্যকলাপ সৃষ্টি হবে।
- বাণিজ্যে বিভিন্ন দেশকে যুক্ত করার সুযোগ: রাশিয়া, মধ্য এশিয়া, ককেসাস, ইরান, পারস্য উপসাগর, ভারত — একাধিক বাজারে দ্রুত ও সাশ্রয়ী কনেক্টিভিটি।
⚠️ চ্যালেঞ্জ বা ঝুঁকি
- ইনফ্রাস্ট্রাকচার এবং বাস্তবায়ন: রেললাইন, টার্মিনাল (যেমন Astara), লজিস্টিক সার্ভিস, কাস্টমস সুসংহত ব্যবস্থা — এগুলোর বাস্তব কাজ এবং সময়মতো সমাপ্তি জরুরি।
- রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা: ককেসাস বা মধ্য এশিয়া অঞ্চলে রাজনৈতিক উত্তেজনা, সীমান্ত বিষয়ক উত্তেজনা, নিরাপত্তার উদ্বেগ করিডরের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
- প্রতিযোগিতা ও বিকল্প করিডর: অন্য ধরনের East–West বা Middle Corridor কিংবা নতুন লজিস্টিক রুটগুলোর বিকাশ হলে INSTC-র গুরুত্ব কমতে পারে।
- কাস্টমস, নিয়ন্ত্রন, নিয়ম ও ট্যারিফ-সংক্রান্ত জটিলতা: তিনদেশের মধ্যে নিয়ম, ট্যারিফ, কাস্টমস প্রসেস হুবহু মিলতে হবে; তার জন্য কার্যকর সমন্বয় এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।
🌐 এই চুক্তি বাংলাদেশের জন্য কি সুযোগ?
বাংলাদেশ, যদি — ভবিষ্যতে — ভারত, মধ্য এশিয়া বা রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য বা ট্রানজিট-রুটে যুক্ত হতে চান, তাহলে INSTC-র উন্নয়ন Bangladesh-এর জন্য ইতিবাচক সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। কারণ:
- ভারত ও পারস্য উপসাগর-পোর্টগুলো থেকে মাল পড়ার পর, রেল+সি+রোড মিশ্রিত INSTC — দ্রুত ও সাশ্রয়ী ট্রানজিট সংযোগ দিতে পারে।
- বাংলাদেশের রফতানি, বিশেষত প্রস্তুত পণ্য, কৃষিজাত পণ্য বা মোড়ককৃত মাল — Eurasia বা মধ্য এশিয়া ও রাশিয়া পর্যন্ত সহজে পাঠানো যেতে পারে।
- বাংলাদেশ নিজের অর্থনৈতিক পাশাপাশি regional transit trade-এ অংশ নিয়ে transit-hub হিসেবে ভূমিকা নিতে পারে।
তবে, এর জন্য দরকার: রাজনৈতিক–ভৌগলিক সমন্বয়, স্থায়ী চুক্তি, এবং ট্রানজিট ব্যবস্থার স্থিরতা।
২০২৫ সালের ২৬–২৯ নভেম্বর বাকি সভায় স্বাক্ষরিত তিন-দেশীয় MoU — ইরান, রাশিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যে — নর্থ–সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডরের (INSTC) পশ্চিম রুটকে কার্যকর, দ্রুত, সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য ট্রানজিট রুট হিসেবে গড়ার উদ্যোগ। unified tariff, fixed pricing, regular block-trains ও logistics ও কাস্টমস সমন্বয়ের ফলে, এই রুট স্বল্প-খরচে মালবাহী পরিবহন নিশ্চিত করতে পারে।
যদি এই চুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার কাজ দ্রুত ও সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয় — পশ্চিম রুট দিয়ে বছরে ৫ মিলিয়ন টন পণ্য চলাচল ২০২৮ থেকে শুরু, ভবিষ্যতে ১৫ মিলিয়ন টন বা তার বেশি — তবে Eurasia, ককেসাস, মধ্য এশিয়া, রাশিয়া থেকে ভারত, পারস্য উপসাগর ও দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত মালবাহী ও বাণিজ্য-প্রবাহে বড় পরিবর্তন আসবে।
এই করিডর শুধু অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর জন্য নয় — প্রতিবেশী দেশ ও অন্যান্য বাণিজ্য অংশীদারদের জন্যও একটি নতুন বাণিজ্যিক দক্ষিণা খুলতে পারে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল, রপ্তানি-নিয়োজিত অর্থনীতির জন্য এমন একটি রুট ভবিষ্যতে যথেষ্ট উপকারী হতে পারে; তবে আমাদের নিজের প্রস্তুতি, নীতিগত সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতিতে সচেতনতা থাকা জরুরি।
Related Posts
View All
ইউরোপ কি যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া নিজেকে রক্ষা করতে পারবে? ন্যাটো প্রধানের কড়া বার্তা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা ছাড়া ইউরোপ নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে—এই ধারণাকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করলেন ন্যাটো মহাসচিব। তাঁর ‘গুড লাক’ মন্তব্য ইউরোপের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, ন্যাটোর ভবিষ্যৎ এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।

B-2 বোমারু থেকে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র: ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী হামলার সম্ভাব্য রূপরেখা |
B-2 স্টিলথ বোমারু বিমান ও টমাহক ক্রুজ মিসাইল—এই দুই অস্ত্রই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার হামলার পথে হাঁটে, তাহলে কীভাবে, কোন অস্ত্র দিয়ে এবং কোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে? এই প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সম্

নোবেল পুরস্কারের সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড দাবি জুড়লেন ট্রাম্প: নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো বার্তা ঘিরে তীব্র বিতর্ক | Trump Links Greenland Ambitions to Nobel Peace Prize in Message to Norway’s Prime Minister
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো এক বার্তায় গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তার আগ্রাসী অবস্থানকে নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার প্রসঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এই মন্তব্য ঘিরে ইউরোপ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।






