ট্রাম্প যদি মাদুরোকে সরান, তবে যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘ সামরিক জটিলতার মুখে পড়তে হবে — বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা | Experts Warn Trump Could Face Long Military Commitment and Chaos if He Tries to Oust Maduro in Venezuela
যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতা বদলের আলোচনায় ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ আবারও সামনে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চাইলে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক জটিলতা ও আঞ্চলিক বিশৃঙ্খলার পরিবেশ তৈরি হতে পারে।

ট্রাম্প যদি মাদুরোকে সরান, তবে যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘ সামরিক জটিলতার মুখে পড়তে হবে — বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা | Experts Warn Trump Could Face Long Military Commitment and Chaos if He Tries to Oust Maduro in Venezuela - Ajker Bishshow
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে ভেনেজুয়েলা ইস্যু বহুদিনের আলোচিত বিষয়। নিকোলাস মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে আমেরিকার অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই কঠোর। এবার ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারেন—এমন সম্ভাবনা ঘিরে বিশেষজ্ঞরা আবারও সতর্ক করছেন, কারণ ট্রাম্প যদি মাদুরো সরকারকে সরাতে সামরিক হস্তক্ষেপের দিকে যান, তবে এর ফল হতে পারে সুদূরপ্রসারী, জটিল এবং অস্থিতিশীল।
মাদুরো সরকারকে সরানো—ট্রাম্প প্রশাসনের পুরোনো লক্ষ্য
ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১7–2021 মেয়াদে বারবার ঘোষণা করেছিলেন যে মাদুরো একজন “স্বৈরশাসক”, এবং ভেনেজুয়েলায় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি সব ধরনের পদক্ষেপ বিবেচনা করছেন। সে সময় ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, বিরোধী নেতা জুয়ান গুইদোকে “অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট” হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশকে সঙ্গে নিয়ে মাদুরোর ওপর আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করে।
তবে সেই সময়েও সামরিক হস্তক্ষেপের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর, কংগ্রেস এবং আন্তর্জাতিক মিত্ররা সতর্ক অবস্থানে ছিল। ফলস্বরূপ, ওয়াশিংটন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং কূটনৈতিক চাপেই সীমাবদ্ধ থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় গেলে আবারও মাদুরো সরকার সরাতে আগ্রহী হতে পারেন—বিশেষ করে পররাষ্ট্রনীতিতে শক্ত অবস্থান দেখানোর প্রতিশ্রুতির কারণে।
সামরিক হস্তক্ষেপ কতটা বাস্তবসম্মত?
বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপ মোটেই সহজ হবে না। দেশটি দক্ষিণ আমেরিকার অন্যতম বৃহৎ ভূখণ্ড, যেখানে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এবং রাশিয়া–ইরান–চীনের দীর্ঘমেয়াদি সমর্থন রয়েছে।
কৌশলগত চ্যালেঞ্জগুলো হলো—
- ভূগোল: ভেনেজুয়েলার জঙ্গল, পাহাড় এবং ঘন নগরায়ণ যেকোনো সামরিক অভিযানের জন্য কঠিন পরিবেশ তৈরি করবে।
- সামরিক প্রতিরোধ: মাদুরো সরকারের অধীনে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী (Colectivos) অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং সুসংগঠিত।
- আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া: ব্রাজিল, কলম্বিয়া, মেক্সিকোসহ ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপকে স্বাগত নাও জানাতে পারে।
- রাশিয়া–ইরান–চীনের ভূরাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া: ভেনেজুয়েলায় তাদের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা স্বার্থ রয়েছে, যা আরও বড় আন্তর্জাতিক উত্তেজনার সৃষ্টি করতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি সামরিক কমিটমেন্ট: বিশেষজ্ঞদের প্রধান উদ্বেগ
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, যদি ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরোকে জোরপূর্বক ক্ষমতাচ্যুত করেন, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রকে ভেনেজুয়েলায় দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে হতে পারে—যা আফগানিস্তান বা ইরাকের মতো দীর্ঘায়িত হতে পারে।
এর কারণ—
১. ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি
মাদুরো পড়ে গেলে দেশটি রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার মুখে পড়তে পারে। শতাধিক ক্ষমতাশালী গোষ্ঠী, রাজনৈতিক দল ও বাহিনী ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়তে পারে। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক বাহিনীকে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার নামে সেখানে বছর বছর থাকতে হতে পারে।
২. মানবিক সংকট আরও বেড়ে যেতে পারে
ভেনেজুয়েলা ইতিমধ্যেই খাদ্য সংকট, মুদ্রাস্ফীতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থার পতন এবং ব্যাপক অভিবাসন সমস্যায় জর্জরিত। হঠাৎ রাজনৈতিক অস্থিরতা এই সংকটকে আরও মারাত্মক করে তুলবে, যা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রকে বিশাল মানবিক সহায়তা ও লজিস্টিকস পাঠাতে হতে পারে।
৩. গণবিক্ষোভ ও সশস্ত্র প্রতিরোধ
মাদুরো সরকারের প্রতি জনগণের সমর্থন কম হলেও সরকারপন্থী মিলিশিয়া ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপকে “আক্রমণ” হিসেবে দেখাবে। তারা সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে—ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যদের দীর্ঘদিন লড়াই চালিয়ে যেতে হতে পারে।
৪. যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চাপ
একটি নতুন বিদেশি যুদ্ধে জড়ানো মার্কিন অর্থনীতি, জনমত এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক চাপ তৈরি করবে।
কংগ্রেসও এমন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য কৌশল কী হতে পারে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা উড়িয়ে না দিলেও তিনি প্রথমে নিম্নলিখিত পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারেন—
১. নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করা
ভেনেজুয়েলার তেল শিল্প প্রায় পুরোপুরি আমেরিকান বাজারের ওপর নির্ভরশীল। ট্রাম্প সেই নির্ভরতা ব্যবহার করে আরও কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারেন।
২. বিরোধী নেতাদের প্রকাশ্য সমর্থন
পূর্বে গুইদোকে যেভাবে সমর্থন দেওয়া হয়েছিল, এবারও যুক্তরাষ্ট্র বিকল্প নেতৃত্বকে সামনে এনে মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে চাপ বাড়াতে পারে।
৩. সাইবার অপারেশন ও গুপ্তচর কার্যক্রম বাড়ানো
সরকারি অবকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক দুর্বল করতে যুক্তরাষ্ট্র গোপনে সাইবার অপারেশন বাড়াতে পারে।
৪. প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা
কলম্বিয়া, ব্রাজিল, গায়ানা—এদের সঙ্গে সামরিক মোতায়েন সংক্রান্ত চুক্তি করা হতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন—এই কৌশলগুলো যদি ব্যর্থ হয়, তখনই ট্রাম্প হস্তক্ষেপের দিকে ঝুঁকতে পারেন।
ল্যাটিন আমেরিকার অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে?
বেশ কয়েকটি দেশ ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলা নীতি নিয়ে সতর্ক। যেমন—
- ব্রাজিলের লুলা সরকার যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সামরিক পদক্ষেপকে স্পষ্টভাবে বিরোধিতা করবে।
- মেক্সিকো “অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ নয়” নীতিতে দৃঢ়।
- কলম্বিয়া যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ হলেও সামরিক অভিযানকে সমর্থন করবে না।
ফলে ল্যাটিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদা আবারও প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
ভেনেজুয়েলার ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ
মাদুরো সরকার নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হলে রাশিয়া বা ইরানের সামরিক উপদেষ্টা বাড়িয়ে দিতে পারে। এমনকি রাশিয়া হয়তো কিউবার মতো কৌশলগত ঘাঁটি তৈরি করতে পারে—যা যুক্তরাষ্ট্রকে আরও উদ্বিগ্ন করবে।
এই পরিস্থিতি কিউবা সংকটের মতো ঠান্ডা যুদ্ধের নতুন অধ্যায়ও ডেকে আনতে পারে।
ট্রাম্প সত্যিই মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চান কি না—তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন—
ভেনেজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপ মানেই যুক্তরাষ্ট্রকে লম্বা সময় সেখানে আটকে থাকা, শক্ত প্রতিরোধের মুখোমুখি হওয়া এবং ল্যাটিন আমেরিকায় নতুন ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করা।
এ ঝুঁকি ট্রাম্প নেবেন কি না—তা নির্ভর করবে তার প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার ও বিশ্ব রাজনীতির বাস্তবতার ওপর।
Related Posts
View All
ইউরোপ কি যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া নিজেকে রক্ষা করতে পারবে? ন্যাটো প্রধানের কড়া বার্তা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা ছাড়া ইউরোপ নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে—এই ধারণাকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করলেন ন্যাটো মহাসচিব। তাঁর ‘গুড লাক’ মন্তব্য ইউরোপের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, ন্যাটোর ভবিষ্যৎ এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।

B-2 বোমারু থেকে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র: ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী হামলার সম্ভাব্য রূপরেখা |
B-2 স্টিলথ বোমারু বিমান ও টমাহক ক্রুজ মিসাইল—এই দুই অস্ত্রই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার হামলার পথে হাঁটে, তাহলে কীভাবে, কোন অস্ত্র দিয়ে এবং কোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে? এই প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সম্

নোবেল পুরস্কারের সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড দাবি জুড়লেন ট্রাম্প: নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো বার্তা ঘিরে তীব্র বিতর্ক | Trump Links Greenland Ambitions to Nobel Peace Prize in Message to Norway’s Prime Minister
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো এক বার্তায় গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তার আগ্রাসী অবস্থানকে নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার প্রসঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এই মন্তব্য ঘিরে ইউরোপ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।






