তাইওয়ানের কাছের দ্বীপে জাপানের ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের পরিকল্পনার সমালোচনা করেছে চীন। | China Criticizes Japan's Missile Deployment Plan Near Taiwan
চীন জাপানের টাইওয়ান-নিকট ওনাগুনি দ্বীপে ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েজ পরিকল্পনা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছে। জাপান বলছে এটি তার প্রতিরক্ষা শক্তি বৃদ্ধির জন্য, কিন্তু চীন এটিকে আঞ্চলিক উত্তেজনা ও সামরিক সংঘর্ষের প্ররোচনা হিসেবে দেখছে। পরিস্থিতি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

তাইওয়ানের কাছের দ্বীপে জাপানের ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের পরিকল্পনার সমালোচনা করেছে চীন। | China Criticizes Japan's Missile Deployment Plan Near Taiwan - Ajker Bishshow
সম্প্রতি জাপান যে পরিকল্পনা নিয়েছে — টাইওয়ানের কাছাকাছি ওনাগুনি (Yonaguni) দ্বীপে মধ্য-পরিসরের সারফেস-টু-এয়ার (মাটি থেকে আকাশে দাগাতে সক্ষম) ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপন — সেটি চীন তীব্রভাবে নিন্দা করেছে। চীনা দপ্তর এই পদক্ষেপকে “অঞ্চলীয় উত্তেজনা সৃষ্টি এবং সামরিক সংঘর্ষের প্ররোচনা” হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে।
পটভূমি: ওনাগুনি দ্বীপের কৌশলগত গুরুত্ব
- ওনাগুনি দ্বীপ জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত এবং টাইওয়ান থেকে প্রায় ১১০ কিলোমিটার (প্রায় ৬৮ মাইল) দূরে রয়েছে।
- জাপান এর সামরিক গুরুত্ব বাড়াতে ইতিমধ্যেই এই দ্বীপে নিরাপত্তা ভিত্তিক উন্নয়ন করেছে, এবং বর্তমান পরিকল্পনাটি ওই কৌশলগত অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে চায়।
- জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী শিনজিরো কইজুমি সম্প্রতি জানিয়েছেন, এই ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েজ করা হলে “জাপানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র হামলা হওয়ার সম্ভাবনা কমবে।”
চীনের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া
- চীনের বিদেশমন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেন, এই পদক্ষেপ একটি পরিকল্পিত প্ররোচনা, যা “অঞ্চলীয় উত্তেজনা তৈরি ও সামরিক সংঘর্ষকে উৎসাহিত করবে।”
- তিনি সতর্ক করে বলেন, জাপানে “ডানপন্থী শক্তি” দেশ ও অঞ্চলকে বিপজ্জনক পথে নিয়ে যাচ্ছে।
- মাও আরও বলেছিলেন, চীন “দেশীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার জন্য দৃঢ় ও সক্ষম” এবং তারা এই ধরণের পদক্ষেপকে ব্যাহত করতে বদ্ধপরিকর।
- চীনা সরকার অভ্যন্তরীণ সম্প্রদায়ে এ ধরণের সিদ্ধান্তকে “অত্যন্ত বিপজ্জনক” হিসেবে ব্যাখ্যা করছে এবং প্রতিবেশী দেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও এতে উদ্বেগ প্রকাশ করার আহ্বান জানিয়েছে।
অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
- চীন ইতিমধ্যেই জাপানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জাপানি সামুদ্রিক খাদ্যবস্তুতে নিষিদ্ধাজ্ঞা, জাপানি সিনেমার রিলিজ বন্ধ, এবং চীনা নাগরিকদের জন্য “জাপানে ভ্রমণ করবেন না” পরামর্শ।
- চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পূর্বেই হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যদি জাপান টাইওয়ান ইস্যুতে সক্রিয়ভাবে হস্তক্ষেপ করে, তাহলে জাপানকে “ধ্বংসাত্মক প্রতিক্রিয়া” দিতে হবে।
- চীনা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জাপানের এই ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েজের পরিকল্পনা “অভিযুক্ত রাজনৈতিক ও সামরিক ইচ্ছার প্রতিফলন” — এক ধরনের সামরিক লড়াইয়ের প্রস্তুতি।
জাপানের ব্যাখ্যা ও প্রতিরক্ষা
- শিনজিরো কইজুমি, জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, বলেন যে এই ইউনিট মোতায়েজ করা হলে এটি জাপানের সুরক্ষা বাড়াবে এবং সামরিক হামলার সম্ভাবনা কমাবে।
- কোইজুমি আরও জানিয়েছেন যে পরিকল্পনাটি “নির্দিষ্টভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছে” এবং এটি দ্রুত অগ্রগতি করছে।
- কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে, জাপান এই পদক্ষেপকে তার দক্ষিণ-পশ্চিম দ্বীপ শৃঙ্খলার (Ryukyu Islands) নিরাপত্তা নীতির অংশ হিসেবে দেখছে, যা টাইওয়ান প্রাসঙ্গিক উত্তেজনায় গুরুত্ব পায়।
চীনের আরও উদ্বেগ এবং বিশ্লেষক দৃষ্টিভঙ্গি
- চীনের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি জাপানের “অন্তর্জাতিক আত্মরক্ষা নীতিতে” পরিবর্তন নির্দেশ করে। তারা যুক্তি দিচ্ছেন যে জাপান পুরাতন প্রতিরক্ষা নীতির বাইরে গড়াচ্ছে এবং এটিতে “রূপান্তর” স্পষ্ট।
- গুলবল টাইমস‑এর বিশ্লেষক লু চাও বলেন, ইয়োনাগুনি দ্বীপে ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েজ করা হচ্ছে যাতে জাপানের কৌশলগত উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয় — শুধু প্রতিরক্ষা নয়, বরং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হিসেবেও।
- Song Zhongping নামের একজন সামরিক বিশ্লেষক বলেছে, এই পদক্ষেপ জাপানের “ক্ষেপণাস্ত্র এবং গোয়েন্দা ব্যবস্থাকে তীব্র করতে পারে” এবং চীনে এটি “অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে হস্তক্ষেপ” হিসেবে দেখা হবে।
- তারা সতর্ক করেছেন যে যদি জাপান তার প্রতিরক্ষা পরিকাঠামো আরও সামরিকভাবে শক্তিশালী করে, তাহলে চীনের প্রতিক্রিয়া সীমিত নাও থাকতে পারে; চীনের প্রতিক্রিয়া জাপানের নিজেই মূল দ্বীপগুলোর দিকে আসতে পারে।
তাইওয়ানের দৃষ্টিকোণ
- তাইওয়ানের উপ-পররӼ্য় মন্ত্রী (Deputy Foreign Minister) ফ্রাঁসোয়া উ বলেন, জাপান একটি সার্বভৌম দেশ হিসেবে তার প্রতিরক্ষা শক্তি বাড়ানোর অধিকার রাখে।
- তিনি যুক্তি দেন যে জাপানের এই পদক্ষেপ টাইওয়ান স্ট্রেইটের নিরাপত্তায় অবদান রাখতে পারে এবং এটি জাপানের বিরুদ্ধে হুমকি তৈরি করবে না, কারণ জাপান “টাইওয়ানের ডিজায়ারের বা শত্রুতা দৃষ্টিকোণ থেকে কাজ করছে না।”
- তাইওয়ান থেকে দেখা যায়, জাপানের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা শুধুমাত্র দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নাও, বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ — বিশেষ করে চীনের প্রতিরোধ বা হুমকির প্রেক্ষাপটে।
বিশ্লেষণ: এই সংঘর্ষের সম্ভাব্য প্রভাব
- অঞ্চলীয় উত্তেজনা বৃদ্ধি
- চীনের অভিযোগ এবং জাপানের প্রতিরক্ষা সিদ্ধান্ত একে অপরকে উত্তেজনা বাড়ানোর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
- যদি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে, বিশেষত আশেপাশের দেশগুলোর মধ্যে যাদের নিরাপত্তা মেজাজ সাঙ্ঘর্ষিকভাবে বেড়ে যেতে পারে।
- বৃহত্তর কৌশলগত গেম
- এটি শুধুমাত্র জাপান-চীন দ্বিপাক্ষিক ইস্যু নয়, বরং বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলগত প্রতিযোগিতার অংশ হতে পারে।
- বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাপান এখন ঐতিহ্যগত “সংরক্ষণমূলক” নীতির বাইরে গড়িয়ে আসছে এবং কৌশলগত স্বাধীনতা ও প্রভাব বিস্তারের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
- প্রতিরক্ষার নতুন ধাপ
- জাপানের জন্য, ওনাগুনিতে ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েজ করা একটি ডিটারেন্স (প্রতিরোধ) রূপে দেখা যেতে পারে — এটি হামলার সম্ভাবনা কমানোর একটি উপায়।
- তবে, প্রতিক্রিয়া যদি মাত্রাকরী হয়, তাহলে চীনের আচরণ আরও প্রতিহিংসাপূর্ণ বা গণনা করা প্রতিক্রিয়া (উদাহরণস্বরূপ, সামরিক গতি বৃদ্ধি) হতে পারে।
- অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব
- ইতিমধ্যেই চীনের তরফ থেকে জাপানের সামুদ্রিক খাদ্যবস্তুতে নিষিদ্ধাজ্ঞা ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা নেওয়া হয়েছে, যা দুই দেশের অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক যোগাযোগকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
- এই ধরণের প্রতিক্রিয়া ভবিষ্যতে আরও গভীর দ্বন্দ্বের সূচনা করতে পারে, বিশেষ করে যদি কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়াগুলো মাত্রাগত হয়।
পরিশেষে: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
- চীনের দৃষ্টিকোণ থেকে, জাপানের এই সিদ্ধান্তকে “যুদ্ধবাজি” হিসেবে দেখা হচ্ছে — যা অঞ্চলজুড়ে স্থিতিশীলতা ও বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতার দৃষ্টিকোণ থেকে বিপজ্জনক।
- কিন্তু জাপান এটি প্রতিরক্ষা হিসেবে ব্যাখ্যা করছে, এবং তার প্রভাব কেবল স্থানীয় সীমাবদ্ধ অঞ্চলে না, বরং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে পরিলক্ষিত হতে পারে।
- তাই এই ঘটনা ভবিষ্যতের জন্য অন্যতম কৌশলগত সূচক হতে পারে — যে ওপরন্তু চীন-জাপান সম্পর্ক এবং টাইওয়ান বিষয়ক উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে, বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়দের (যেমন যুক্তরাষ্ট্র) কূটনৈতিক পদক্ষেপে নতুন গতি পেতে পারে।
Related Posts
View All
ইউরোপ কি যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া নিজেকে রক্ষা করতে পারবে? ন্যাটো প্রধানের কড়া বার্তা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা ছাড়া ইউরোপ নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে—এই ধারণাকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করলেন ন্যাটো মহাসচিব। তাঁর ‘গুড লাক’ মন্তব্য ইউরোপের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, ন্যাটোর ভবিষ্যৎ এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।

B-2 বোমারু থেকে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র: ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী হামলার সম্ভাব্য রূপরেখা |
B-2 স্টিলথ বোমারু বিমান ও টমাহক ক্রুজ মিসাইল—এই দুই অস্ত্রই ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার হামলার পথে হাঁটে, তাহলে কীভাবে, কোন অস্ত্র দিয়ে এবং কোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে? এই প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সম্

নোবেল পুরস্কারের সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড দাবি জুড়লেন ট্রাম্প: নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো বার্তা ঘিরে তীব্র বিতর্ক | Trump Links Greenland Ambitions to Nobel Peace Prize in Message to Norway’s Prime Minister
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো এক বার্তায় গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তার আগ্রাসী অবস্থানকে নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার প্রসঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এই মন্তব্য ঘিরে ইউরোপ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।






