পুতিনের বাসভবনে ৯১টি ড্রোন হামলার অভিযোগ: রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ ও শান্তি আলোচনার সংকট| 91 Drone Attacks on Putin's Residence Alleged: Crisis in Russia-Ukraine War and Peace Talks
পুতিনের সরকারি বাসভবনে ড্রোন হামলার অভিযোগ ঘিরে নতুন উত্তেজনা। ইউক্রেনের অস্বীকৃতি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ও শান্তি আলোচনার বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ।

পুতিনের বাসভবনে ৯১টি ড্রোন হামলার অভিযোগ: রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ ও শান্তি আলোচনার সংকট| 91 Drone Attacks on Putin's Residence Alleged: Crisis in Russia-Ukraine War and Peace Talks - Ajker Bishshow
বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম শক্তিশালী নেতা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। দীর্ঘদিন ধরেই কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে থাকা এই নেতার সরকারি বাসভবনকে ঘিরে এবার ভয়াবহ অভিযোগ তুলেছে মস্কো। রাশিয়ার দাবি, ইউক্রেন ৯১টি ড্রোন ব্যবহার করে পুতিনের একটি সরকারি বাসভবনে হামলার চেষ্টা চালিয়েছে। যদিও রাশিয়া বলছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সব ড্রোন ভূপাতিত করেছে এবং কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি, তবুও এই অভিযোগ ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধে।
এই ঘটনার সময়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ঠিক এই সময়েই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাব্য আলোচনা নিয়ে নতুন আশার কথা শোনা যাচ্ছিল। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এই হামলার অভিযোগ কি বাস্তব নিরাপত্তা হুমকি, নাকি শান্তি প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার একটি রাজনৈতিক কৌশল?
রাশিয়ার অভিযোগ: কী বলছেন ল্যাভরভ?
রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ জানান, সোমবার রাতে নোভগরোড অঞ্চলের ভালদাই এলাকায় অবস্থিত প্রেসিডেন্ট পুতিনের একটি সরকারি বাসভবন লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার চেষ্টা চালানো হয়। রুশ কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, ইউক্রেন একসঙ্গে ৯১টি ড্রোন ব্যবহার করে এই হামলার চেষ্টা করে।
ল্যাভরভ বলেন, রাশিয়ার উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্রুত সক্রিয় হয়ে সব ড্রোন ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। তাঁর ভাষায়, এটি ছিল একটি পরিকল্পিত ও সমন্বিত হামলার চেষ্টা, যা সরাসরি রুশ রাষ্ট্রপ্রধানের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।
তবে এই অভিযোগের সঙ্গে সঙ্গে রাশিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেনি—হামলার সময় প্রেসিডেন্ট পুতিন ওই বাসভবনে উপস্থিত ছিলেন কি না, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট বক্তব্য দেওয়া হয়নি। এই নীরবতাই আন্তর্জাতিক মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
প্রমাণের অভাব ও বিতর্ক
রাশিয়ার দাবি যত বড়ই হোক, এখন পর্যন্ত এই হামলার পক্ষে কোনো স্বাধীন ও যাচাইযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি। কোনো ভিডিও ফুটেজ, ধ্বংসাবশেষের ছবি কিংবা প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আসেনি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ওই এলাকায় বড় ধরনের কোনো বিস্ফোরণ বা সংঘর্ষের চিহ্ন দেখা যায়নি। ফলে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এত বড় পরিসরের ড্রোন হামলা হলে তার দৃশ্যমান প্রমাণ থাকার কথা।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—৯১টি ড্রোন যদি সত্যিই আকাশে প্রবেশ করত, তাহলে সেটি কি পুরোপুরি গোপন রাখা সম্ভব?
ইউক্রেনের পাল্টা অবস্থান: ‘মিথ্যা ও সাজানো অভিযোগ’
রাশিয়ার অভিযোগের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ইউক্রেন। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সরাসরি এই অভিযোগকে ‘মনগড়া’ ও ‘মিথ্যা’ বলে অভিহিত করেছেন।
জেলেনস্কির মতে, ইউক্রেন এ ধরনের কোনো হামলায় জড়িত নয়। তাঁর অভিযোগ, রাশিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে এমন বক্তব্য দিচ্ছে যাতে শান্তি আলোচনা ব্যাহত হয় এবং আন্তর্জাতিক মহলে ইউক্রেনকে আগ্রাসী হিসেবে তুলে ধরা যায়।
ইউক্রেন আরও দাবি করেছে, অতীতেও রাশিয়া এমন অভিযোগ তুলে কিয়েভ ও অন্যান্য শহরে নতুন করে হামলার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। তাই এই বক্তব্যকে তারা রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা হিসেবেই দেখছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ও ট্রাম্পের মন্তব্য
এই ঘটনার সময় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। হামলার অভিযোগ ওঠার ঠিক একদিন আগে ফ্লোরিডায় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
এরপর হোয়াইট হাউস জানায়, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে ট্রাম্প ও পুতিনের মধ্যে একটি ‘ইতিবাচক’ ফোনালাপ হয়েছে। যদিও আলোচনার বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি, তবে এই ফোনালাপ যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন আশা তৈরি করেছিল।
কিন্তু পুতিনের বাসভবনে ড্রোন হামলার অভিযোগ প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, “এটা সঠিক সময় নয়।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই হামলার বিষয়ে পুতিন নিজেই তাকে অবহিত করেছেন। ট্রাম্পের এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট, যুক্তরাষ্ট্রও এই অভিযোগের সময় ও প্রেক্ষাপট নিয়ে সন্তুষ্ট নয়।
বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি: কোথায় দাঁড়িয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেন?
২০২২ সালে শুরু হওয়া রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ এখনো থামেনি। ২০২৫ সালের শেষ দিকে এসেও যুদ্ধটি একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে রূপ নিয়েছে।
বর্তমান বাস্তবতায়—
- ইউক্রেন পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে প্রবল সামরিক চাপের মুখে রয়েছে।
- রাশিয়া ধীরে ধীরে হলেও কিছু এলাকায় অবস্থান শক্ত করছে।
- দুই পক্ষই ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও দূরপাল্লার হামলার ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ এখন শুধু সামরিক নয়; এটি কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়েও পরিণত হয়েছে। এই অবস্থায় পুতিনের বাসভবনে হামলার অভিযোগ যুদ্ধের বর্ণনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
শান্তি আলোচনা: আশা নাকি কৌশল?
যুদ্ধ বন্ধে শান্তি আলোচনা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কথাবার্তা চললেও বাস্তবে এখনো কোনো লিখিত চুক্তি বা আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র মধ্যস্থতার চেষ্টা চালালেও রাশিয়া ও ইউক্রেন—দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থান শক্ত রাখতে চায়।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই ড্রোন হামলার অভিযোগ রাশিয়ার জন্য একটি কৌশলগত হাতিয়ার হতে পারে। এর মাধ্যমে মস্কো আন্তর্জাতিক মহলে দেখাতে চাইছে যে তারা এখনো হুমকির মুখে রয়েছে এবং তাই কঠোর সামরিক পদক্ষেপ তাদের জন্য ‘ন্যায্য’।
অন্যদিকে ইউক্রেন মনে করছে, এই ধরনের অভিযোগ শান্তি আলোচনাকে দুর্বল করবে এবং যুদ্ধকে আরও দীর্ঘায়িত করবে।
পুতিনের বাসভবনে ৯১টি ড্রোন হামলার অভিযোগ সত্য হোক বা না হোক, এটি স্পষ্ট যে এই ঘটনা রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে। প্রমাণের অভাব, ইউক্রেনের সরাসরি অস্বীকৃতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সংযত প্রতিক্রিয়া—সব মিলিয়ে এই দাবি এখনো প্রশ্নবিদ্ধ।
যুদ্ধ ও শান্তির মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই মুহূর্তে বিশ্ব তাকিয়ে আছে—এই অভিযোগ কি বাস্তব নিরাপত্তা হুমকির প্রতিফলন, নাকি ইতিহাসে আরেকটি রাজনৈতিক দাবির অধ্যায় হয়ে থাকবে?
Watch Video
Related Posts
View All
“মার্কিন নৌযান ডুবিয়ে দাও”: ট্যাঙ্কার জব্দের পর রুশ সংসদ সদস্যের হুমকিতে বিশ্ব রাজনীতিতে উত্তেজনা
আন্তর্জাতিক জলসীমায় রাশিয়ান পতাকাবাহী তেল ট্যাঙ্কার জব্দের পর যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। রুশ সংসদ সদস্যের সামরিক হুমকি বিশ্ব রাজনীতিতে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। নীরব সাগর কি এবার সংঘাতের মঞ্চ হতে যাচ্ছে?

ভেনেজুয়েলার পর গ্রিনল্যান্ড: ট্রাম্পের আঙুল, NATO-র ভবিষ্যৎ ও নতুন ভূরাজনৈতিক সংকেত | Greenland after Venezuela: The Finger of Space, the Future of NATO, and New Geopolitical Signals
ভেনেজুয়েলার ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গ নতুন করে বিশ্ব রাজনীতিতে ঝড় তুলেছে। ডেনমার্ক সতর্ক করেছে—গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন হামলা মানেই NATO-র অবসান। এই সংকট আসলে কী ইঙ্গিত দিচ্ছে?

মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রে বন্দি, ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি: ভেনেজুয়েলার তেল আমরা নিয়ন্ত্রণ করবো | Maduro Brought to the US as Trump Vows to Take Control of Venezuela’s Oil
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে এনে বিচারের মুখোমুখি করার মধ্যেই ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন—ভেনেজুয়েলার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও দেশটির বিপুল তেল সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে নেওয়া হবে। এই ঘটনাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক ও উদ্বেগ।






